কার ইনসুরেন্স নেওয়ার আগে যা যা জানা জরুরি

ফাইন্যান্স ভিশন
By -
0
ফাইন্যান্স ভিশন - সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
 

আজকাল অনেকেই গাড়ি বা বাইকের ইন্স্যুরেন্স করাতে চান না বা এটি গুরুত্ব দিতে চান না, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক বিপদের কারণ হতে পারে। গাড়ি কেনার পর ইনসুরেন্স করানো শুধু আইনি বাধ্যবাধকতাই নয়, দুর্ঘটনা বা ক্ষতির সময় বড় আর্থিক সুরক্ষাও দেয়। কিন্তু সঠিক পলিসি বেছে না নিলে দরকারের সময় ঠিকমতো কভারেজ নাও পেতে পারেন। আজকের পোস্টে জানব কার ইনসুরেন্স নেওয়ার আগে কী কী বিষয় খেয়াল রাখা উচিত, এবং এটা ইনকাম ট্যাক্সে ছাড় দেয় কিনা।

১. থার্ড পার্টি বনাম কম্প্রিহেনসিভ ইনসুরেন্স

কার ইনসুরেন্স মূলত দুই ধরনের হয়:

  • থার্ড পার্টি ইনসুরেন্স — এটা আইনত বাধ্যতামূলক। এটা শুধু অন্য কারো গাড়ি, সম্পত্তি বা মানুষের ক্ষতি হলে সেই খরচ কভার করে। নিজের গাড়ির ক্ষতি এখানে কভার হয় না।
  • কম্প্রিহেনসিভ ইনসুরেন্স — এটা থার্ড পার্টি কভারেজের পাশাপাশি নিজের গাড়ির ক্ষতি, চুরি, আগুন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদিও কভার করে। প্রিমিয়াম বেশি হলেও সুরক্ষা অনেক বেশি।

সাধারণত নতুন বা দামি গাড়ির জন্য কম্প্রিহেনসিভ ইনসুরেন্স নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

২. IDV (Insured Declared Value) বুঝে নিন

IDV হলো আপনার গাড়ির বর্তমান বাজারমূল্যের হিসাব, যার ভিত্তিতে ক্লেইমের সময় ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হয়। অনেকে প্রিমিয়াম কমাতে কম IDV সেট করেন, কিন্তু এতে গাড়ি চুরি হলে বা সম্পূর্ণ নষ্ট হলে কম টাকা পাওয়া যায়। তাই IDV বাস্তবসম্মতভাবে ঠিক করা উচিত।

৩. প্রয়োজনীয় অ্যাড-অন কভার বেছে নিন

কম্প্রিহেনসিভ পলিসির সাথে কিছু অতিরিক্ত অ্যাড-অন কভার নেওয়া যায়:

  • জিরো ডেপ্রিসিয়েশন কভার — ক্লেইমের সময় গাড়ির যন্ত্রাংশের ডেপ্রিসিয়েশন বাদ না দিয়ে পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায়
  • ইঞ্জিন প্রোটেকশন কভার — জলাবদ্ধতা বা তেল লিকেজের কারণে ইঞ্জিনের ক্ষতি হলে কভার করে
  • রোডসাইড অ্যাসিস্ট্যান্স — গাড়ি রাস্তায় বিকল হলে সাহায্য পাওয়া যায়
  • নো ক্লেইম বোনাস (NCB) প্রোটেকশন — একটা ক্লেইম করলেও আপনার NCB ছাড় অক্ষত থাকে

সব অ্যাড-অন সবার দরকার হয় না — নিজের গাড়ির বয়স, ব্যবহারের ধরন এবং বাজেট বুঝে বেছে নেওয়া উচিত।

৪. ক্লেইম সেটেলমেন্ট রেশিও যাচাই করুন

ইনসুরেন্স কোম্পানি বেছে নেওয়ার আগে দেখে নিন তাদের ক্লেইম সেটেলমেন্ট রেশিও কেমন — অর্থাৎ কতগুলো ক্লেইমের মধ্যে কতগুলো তারা সফলভাবে সেটেল করেছে। এই তথ্য সাধারণত IRDAI-এর বার্ষিক রিপোর্টে পাওয়া যায়।

৫. নো ক্লেইম বোনাস (NCB)-এর সুবিধা নিন

একটা পলিসি বছরে যদি কোনো ক্লেইম না করেন, তাহলে পরের বছর প্রিমিয়ামে ছাড় পাওয়া যায়, যাকে NCB বলে। এই ছাড় বছরের পর বছর জমতে থাকে এবং গাড়ি বদলালেও নতুন গাড়িতে ট্রান্সফার করা যায়।

৬. পলিসির এক্সক্লুশন ভালো করে পড়ুন

পলিসি ডকুমেন্টে কোন কোন পরিস্থিতিতে ক্লেইম প্রত্যাখ্যাত হতে পারে, তা আগে থেকে জেনে রাখা উচিত। সাধারণ এক্সক্লুশনের মধ্যে থাকে:

  • মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা
  • বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো
  • বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার (যদি পলিসিতে উল্লেখ না থাকে)
  • স্বাভাবিক wear and tear (ব্যবহারজনিত ক্ষয়)

কার ইনসুরেন্স কি ইনকাম ট্যাক্সে ছাড় দেয়?

এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর — ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির ইনসুরেন্স প্রিমিয়ামে ইনকাম ট্যাক্সে কোনো ছাড় পাওয়া যায় না।

আয়কর আইনের 80C ধারা (লাইফ ইনসুরেন্স, PPF, ELSS ইত্যাদির জন্য) বা 80D ধারা (হেলথ ইনসুরেন্সের জন্য) — কোনোটার আওতাতেই মোটর বা কার ইনসুরেন্স পড়ে না। তাই ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কেনা গাড়ির ইনসুরেন্স প্রিমিয়াম দিয়ে ট্যাক্স রিটার্নে কোনো ডিডাকশন ক্লেইম করা যায় না।

একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম

যদি গাড়িটি ব্যবসা বা পেশাগত কাজে ব্যবহার করা হয় — যেমন ট্যাক্সি সার্ভিস, ডেলিভারির কাজে, বা কোম্পানির নামে রেজিস্টার্ড গাড়ি — তাহলে সেই গাড়ির ইনসুরেন্স প্রিমিয়াম ব্যবসার খরচ (Business Expense) হিসেবে দেখানো যায়, যা ব্যবসার লাভ থেকে বাদ যায়। তবে এটা ব্যক্তিগত ট্যাক্স ডিডাকশন নয় — এটা ব্যবসার হিসাবরক্ষণের অংশ, এবং এর জন্য প্রপার ডকুমেন্টেশন ও অ্যাকাউন্টিং প্রয়োজন হয়।


শেষ কথা: কার ইনসুরেন্স বেছে নেওয়ার সময় শুধু কম প্রিমিয়াম দেখলেই হবে না — কভারেজ, IDV, ক্লেইম সেটেলমেন্ট রেকর্ড এবং এক্সক্লুশন ভালো করে যাচাই করে নেওয়া উচিত। আর ট্যাক্স ছাড়ের আশায় ব্যক্তিগত গাড়ির ইনসুরেন্স কেনার দরকার নেই, কারণ সেটা আয়কর আইনে অন্তর্ভুক্ত নয়।

বিঃদ্রঃ এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে। নির্দিষ্ট ট্যাক্স পরিস্থিতির জন্য একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা ট্যাক্স কনসালট্যান্টের সাথে পরামর্শ করা ভালো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default