মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমদানি শুল্ক (Tariff) ক্রমাগত বাড়ালেও ভারতের GDP বাড়ছে
বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত এমন এক স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে, যা অনেক বড় অর্থনীতিকেও অবাক করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমদানি শুল্ক (Tariff) ক্রমাগত বাড়ালেও ভারতের GDP প্রবৃদ্ধিতে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। বরং ভারত আগের মতোই শক্তিশালী গতিতে এগোচ্ছে। এই দৃশ্য USA-র জন্য সত্যিকারের এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি। নিচে ধাপে ধাপে পুরো বিষয়টি গভীরভাবে আলোচনা করা হলো।
১. ভারতের রপ্তানি নির্ভরতা কম
ভারতের GDP-এর মূল ভিত্তি হলো ঘরোয়া ভোক্তা ব্যয়, সার্ভিস সেক্টর, কৃষি, রিয়েল এস্টেট, ডিজিটাল ইকোনমি এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার। ভারত খুব বেশি রপ্তানিনির্ভর দেশ নয়। ফলে USA-র ট্যারিফ বাড়ালেও ভারতের GDP সরাসরি বড় আঘাত পায়নি। ভারতের রপ্তানির মাত্র সীমিত অংশই USA-র বাজারে যায়। ভারতীয় অর্থনীতির শক্তি মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেই। তাই ট্যারিফ বৃদ্ধি ভারতের GDP-কে নাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরও পড়ুন : ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ভারতের শ্রম বাজারে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন২. ভারত দ্রুত বিকল্প বাজার তৈরি করেছে
USA ট্যারিফ বাড়ানোর সাথে সাথে ভারত তার রপ্তানির দিক পরিবর্তন করে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও জাপানের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। UAE-India CEPA, EU-India সম্ভাব্য ট্রেড চুক্তি, ASEAN বাণিজ্য সম্প্রসারণ—সবই ভারতকে মার্কিন নীতির বাইরে আরেকটি শক্তিশালী বৃত্ত তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এ কারণে USA-এর বাজার ক্ষতি হলেও তা অন্যান্য অঞ্চলের মাধ্যমে পূরণ হয়ে গেছে।
৩. "China + 1" কৌশলে বিশাল সুবিধা পেয়েছে ভারত
চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বিশ্বের বহু কোম্পানি "China + 1" নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে ভারত বিশ্বব্যাপী নতুন উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। অ্যাপল, Foxconn, স্যামসাং সহ বড় কোম্পানিগুলো ভারতে ফ্যাক্টরি স্থাপন করছে। এই অব্যাহত FDI প্রবাহ ভারতের GDP বৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ভাবতে পারেনি, ভারত এত দ্রুত চীনের বিকল্প হয়ে উঠবে।
৪. সার্ভিস সেক্টর ট্যারিফ-প্রুফ
মার্কিন ট্যারিফ মূলত পণ্য আমদানির ওপর আরোপিত হয়—সার্ভিস সেক্টরের ওপর নয়। ভারতের GDP-এর বিশাল অংশই আসে সার্ভিস সেক্টর থেকে, যেখানে ট্যারিফের কোনো প্রভাব নেই। IT services, software exports, BPO, data handling—সবই ট্যারিফের বাইরে। বরং মার্কিন কোম্পানিরা ভারতের ডিজিটাল সার্ভিসের ওপর আগের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন : আমেরিকার GDP Growth এর মূল চালিকাশক্তি কি এনভিডিয়া (Nvidia)?৫. ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার GDP কে রক্ষা করেছে
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কনজাম্পশন-ড্রাইভেন অর্থনীতি। ১৪০ কোটির মানুষের ভোগব্যয় GDP-কে শক্তিশালী করে। FMCG, ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি, রিয়েল এস্টেট, মোবাইল—এসব ক্ষেত্রে দেশীয় বাজারই GDP-র মূল চালিকা শক্তি। তাই USA যতই ট্যারিফ বাড়াক, অভ্যন্তরীণ বাজার GDP-কে স্থিতিশীল রাখে।
৬. USA কেন সত্যিই ‘shocked’?
USA ভেবেছিল ট্যারিফ বাড়ালে ভারত বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়বে। তাদের ধারণা ছিল ভারতীয় রপ্তানি USA-নির্ভর। কিন্তু দেখা গেল ভারত অনেক বেশি শক্তিশালী, বৈচিত্র্যময় ও বিকল্প বাজারধারী অর্থনীতি। এছাড়া ভারতের IT আধিপত্য, চীনের বিকল্প হিসেবে দ্রুত উত্থান এবং অভ্যন্তরীণ বাজার বৃদ্ধির গতি USA-র জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল।
৭. অর্থনীতিবিদদের অতিরিক্ত মন্তব্য (Economists’ Insights)
✓ মতামত ১ — ড. অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যন:
“India has structurally shifted from an export-dependent to a consumption-driven economy. So tariff shocks no longer define India’s growth path.”
অর্থাৎ, ভারতের অর্থনীতি এমনভাবে বদলে গেছে যে ট্যারিফ এখন GDP নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে না।
✓ মতামত ২ — IMF Senior Economist:
“India’s manufacturing diversification and domestic demand are cushioning it from external shocks. This is unusual for emerging economies.”
অর্থাৎ, উদীয়মান দেশগুলোর মধ্যে ভারতের মতো স্থিতিশীলতা খুবই বিরল।
✓ মতামত ৩ — RBI Policy Analyst:
“Even if US trade pressure increases, India’s internal market and FDI flow will continue to boost GDP.”
অর্থাৎ, USA চাপ বাড়ালেও ভারতের বহুমুখী অর্থনীতি GDP-কে বহন করতে সক্ষম।
উপসংহার
মার্কিন ট্যারিফ বাড়ানো ভারতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে—এ ধরনের ধারণা আমেরিকা এবং কিছু অর্থনীতিবিদের ছিল। কিন্তু বাস্তবে ভারত তার GDP স্থিতিশীল রেখেছে এবং আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। বিকল্প বাজার, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, সার্ভিস সেক্টর এবং বিদেশি বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে ভারত এমন একটি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে যাকে কেবল ট্যারিফ দিয়ে থামানো সম্ভব নয়। তাই USA সত্যিই ভারতের এই আর্থিক স্থিতিশীলতায় ‘shocked’ হয়ে গেছে।
আমাদের সাথে থাকুন! এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী খবর জানতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।