আমি গত ৮ বছর ধরে মিউচুয়াল ফান্ডে টুকটাক বিনিয়োগ করি। অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। কিন্তু এই সেপ্টেম্বরের মতো ঘটনা খুব কমই দেখেছি। একদিকে রুপি হঠাৎ করে ১০ সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে গেল, অন্যদিকে তেলের দাম বাড়ায় শেয়ার বাজার পড়ছে।
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, দাদা এই সময়ে SIP বন্ধ করে দেবো নাকি? আজ সেই সব প্রশ্নের উত্তর একেবারে সহজ বাংলায় দেওয়ার চেষ্টা করব।
হঠাৎ রুপি এত শক্তিশালী হলো কেন?
গত মাস পর্যন্তও রুপির অবস্থা খুব খারাপ ছিল। আমেরিকায় সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী ভারত থেকে টাকা তুলে নিচ্ছিল।
তাহলে এই সপ্তাহে কী এমন হলো?
আসলে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) মাঠে নেমেছে। বাজারের খবর অনুযায়ী, RBI বাজারে ডলার বিক্রি করে রুপিকে সামলেছে। রুপি এখন একটা সরু গণ্ডির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, একদিকে RBI এর হস্তক্ষেপ আর অন্যদিকে তেলের দামের চাপ।
এর পেছনে বড় কারণ হলো ডলারের জোগান। RBI এর কিছু বিশেষ স্কিম, যেমন FCNR(B) স্কিমের মাধ্যমে প্রচুর ডলার দেশে এসেছে। সেই ডলার দিয়েই RBI বাজারকে সামলাচ্ছে। সহজ কথায়, RBI এর হাতে এখন প্রচুর ডলার আছে, তাই সে বাজারে ডলার ছেড়ে রুপির দাম ধরে রাখতে পারছে।
এটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য ভালো। রুপি শক্তিশালী হলে তেলের দাম কমে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ার চাপটা কমে।
১৩৬ বিলিয়ন ডলারের গল্পটা কী? এটা কি ভালো?
আপনি হয়তো খবরে দেখেছেন, ভারতের হাতে ১৩৬ বিলিয়ন ডলার এসেছে। শুনতে খুব ভালো লাগছে, তাই না? কিন্তু এর একটা অন্য দিকও আছে।
এই টাকাটা কিন্তু শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ নয়। এটা মূলত প্রবাসী ভারতীয়দের জমা করা টাকা। RBI বেশি সুদ দিয়ে এই টাকা দেশে এনেছে।
ভালো দিকটা কী?
foreign বিনিয়োগকারীরা যখন দেখে ভারতের হাতে প্রচুর ডলার আছে, তখন তারা ভরসা পায়। তারা ভাবে, ভারত তার মুদ্রাকে রক্ষা করতে পারবে। তাই তারা টাকা তুলে নেয় না।
খারাপ দিকটা কী?
এই টাকা ২-৩ বছর পর সুদ সমেত ফেরত দিতে হবে। তখন যদি তেলের দাম আরও বাড়ে বা বিশ্ব বাজারে সমস্যা হয়, তখন আবার রুপির উপর চাপ পড়বে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা এখন রুপিকে সাহায্য করলেও ভবিষ্যতের জন্য একটা ঝুঁকি তৈরি করছে।
তাই এই রুপির শক্তিশালী হওয়া দেখে আবেগে ভেসে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
তেলের দামের কাঁটাটা বিঁধছে কোথায়?
রুপিকে একদিকে RBI টেনে উপরে তুলছে, অন্যদিকে তেলের দাম টেনে নিচে নামাচ্ছে।
আপনারা জানেন, ইরান-আমেরিকার ঝামেলার জন্য তেলের দাম আবার বাড়ছে। ভারত তার ৮০% এর বেশি তেল বাইরে থেকে কেনে। তাই তেলের দাম বাড়লে আমাদের অনেক বেশি ডলার দিয়ে তেল কিনতে হয়।
তেলের দাম বাড়লে কী হয়?
আমাদের আমদানি খরচ বেড়ে যায় এবং বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ে। তেল কোম্পানিগুলোকে বেশি ডলার কিনতে হয়, ফলে রুপি দুর্বল হয়।
এই টানাটানির জন্যই RBI কে বারবার বাজারে এসে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে।
এর প্রভাব আপনার ফান্ডে কী পড়বে?
- আপনার যদি এমন কোনো ইক্যুইটি ফান্ড থাকে যেখানে বিমান, রঙ, FMCG কোম্পানি বেশি আছে, সেটা কিছুদিন কমতে পারে।
- তেলের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, তাই RBI সহজে সুদের হার কমাবে না। তাই যাদের কাছে লং-টার্ম ডেট ফান্ড আছে, তাদের রিটার্ন কিছুদিন কম থাকতে পারে।
- এই সময় সোনা একটু বাড়ে। তাই আপনার পোর্টফোলিওতে ৫-১০% সোনা থাকলে ভালো।
SEBI এর নতুন নিয়ম, আপনার জন্য সুখবর
এই সব হৈচৈ এর মাঝে SEBI একটা খুব ভালো নিয়ম আনতে চলেছে।
এখন একটা মিউচুয়াল ফান্ড যদি একদিনে ১০০ কোটি টাকার শেয়ার কেনে আর ৯০ কোটি টাকার শেয়ার বেচে, তাহলে তাকে পুরো ১০০ কোটির ব্যবস্থা করতে হয়। নতুন নিয়মে শুধু ১০ কোটির ব্যবস্থা করলেই হবে। বাকিটা নেট সেটেলমেন্ট হয়ে যাবে।
এটা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আগে থেকেই ছিল, এবার আমাদের দেশের ফান্ডের জন্যও হচ্ছে।
এতে আপনার লাভ কী? ফান্ড হাউসের খরচ কমবে, আর সেই লাভটা শেষ পর্যন্ত আপনার NAV এর মধ্যেই আসবে। লেনদেন আরও দ্রুত এবং নিরাপদ হবে।
তাহলে এই সেপ্টেম্বরে আপনার কী করা উচিত?
আমি কোনো উপদেষ্টা নই, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
১. SIP বন্ধ করবেন না। পারলে একটু বাড়ান।
বাজার যখন পড়ে, তখন SIP বিনিয়োগকারীদের জন্য সেটা আশীর্বাদ। আপনি একই টাকায় বেশি ইউনিট পান। তাই ভয় পেয়ে SIP বন্ধ করবেন না। যদি হাতে একটু বাড়তি টাকা থাকে, তাহলে পরের দুই মাস ১০% টপ-আপ করতে পারেন।
২. ডেট ফান্ডটা একটু দেখুন।
আমেরিকায় সুদের হার ৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আমাদের এখানেও সুদ সহজে কমবে না। এই সময়ে লিকুইড, আল্ট্রা শর্ট টার্ম ফান্ডে ভালো সুদ পাওয়া যাচ্ছে। যদি আপনার বয়স একটু বেশি হয় বা আপনার স্থিতিশীল রিটার্ন দরকার হয়, তাহলে লং টার্ম ফান্ড থেকে কিছু টাকা শর্ট টার্ম ফান্ডে আনতে পারেন।
৩. ডলারের দিকে তাকান।
রুপি যখন শক্তিশালী থাকে, তখন ডলার কেনা সস্তা হয়। যদি আপনার পোর্টফোলিওতে বিদেশি ফান্ড না থাকে, তাহলে এখন ৫% থেকে ১০% বিদেশি ফান্ড যোগ করার কথা ভাবতে পারেন। পরে রুপি দুর্বল হলে আপনি লাভবান হবেন।
আমার শেষ কথা: বাজারের এই ওঠা-নামা থাকবেই। রুপি আজ শক্তিশালী, কাল দুর্বল হতে পারে। তেলের দাম আজ বেশি, কাল কমতে পারে। কিন্তু আপনার লক্ষ্য তো ৫ বছর বা ১০ বছর পরের। তাই প্রতিদিনের খবরে ভয় না পেয়ে নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকুন। ইমার্জেন্সি ফান্ড লিকুইডে রাখুন, SIP চালিয়ে যান।
দ্রষ্টব্য: এটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে লেখা। কোনো বিনিয়োগের পরামর্শ নয়। বিনিয়োগ করার আগে অবশ্যই আপনার আর্থিক উপদেষ্টার সাথে কথা বলুন।
