নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাড়তি নজর তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সবশেষ প্রতিবেদন, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) জুলাই ২০২৬, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে হালনাগাদ পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে, যেখানে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা—দুটোরই ইঙ্গিত মিলেছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি: চলতি বছরে কিছুটা মন্থর, আগামী বছরে গতি ফেরার আশা
এডিবির হিসাবে ২০২৬ অর্থবছরে (৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত) বাংলাদেশের অর্থনীতি ৩.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে গত এপ্রিলের পূর্বাভাসের ৪.০ শতাংশের তুলনায় কম । এই নিম্নমুখী সংশোধনের পেছনে মূলত দুর্বল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে ঝিমুনি এবং সরবরাহ-পক্ষীয় নানা সীমাবদ্ধতাকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যদিও অভ্যন্তরীণ চাহিদা তুলনামূলক শক্তিশালী থাকায় প্রবৃদ্ধি একেবারে ধসে পড়েনি।
তুলনার জন্য বলা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ দেখানো হয়েছিল, যা এডিবির চূড়ান্ত পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি ছিল । এতে বোঝা যায়, সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নের মধ্যে খানিকটা ফারাক রয়ে গেছে।
তবে আশার কথা হলো, চলতি ২০২৭ অর্থবছরে (জুলাই ২০২৬-জুন ২০২৭) প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে ৪.৫ শতাংশে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে । প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে শক্তিশালী প্রবাসী আয় প্রবাহ, স্থিতিশীল সেবা খাতের কার্যক্রম এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহজীকরণ ব্যবস্থা , যদিও সার্বিক সামষ্টিক-আর্থিক পরিবেশ ছিল বেশ কড়া। প্রসঙ্গত, সরকার এই অর্থবছরে র্বাভাস অনেকটাই কম।
মূল্যস্ফীতি: চাপ থেকে সহসাই মুক্তি নেই
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে ছবিটা এখনও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৬ অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রাখা হলেও ২০২৭ অর্থবছরের জন্য তা বাড়িয়ে ৮.৮ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা এপ্রিলের পূর্বাভাসের ৮.৫ শতাংশের চেয়ে বেশি । এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব, বিনিময় হারের মাধ্যমে মূল্য সংক্রমণ এবং খাদ্য ও সেবা খাতে চলমান মূল্যস্ফীতি মূল্যস্ফীতি হ্রাসের গতিকে ধীর করে দিতে পারে ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশীয় জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যে সাম্প্রতিক সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, ইউটিলিটি ও অন্যান্য ভোক্তা পণ্যের দামে ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয়েও রাশ টানছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে ২০২৭ অর্থবছরে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হওয়ার সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে সহজ বিধিবিধান, উন্নত সুশাসন, কর প্রশাসনে সংস্কার এবং প্রবাসী আয় প্রবাহে ধারাবাহিক প্রণোদনা ভোগ ও বিনিয়োগ চাঙা করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মানুষের মাথাপিছু আয়ে প্রবৃদ্ধি সীমিত
সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আয়ের চিত্রও গুরুত্বপূর্ণ। এডিবির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ২.৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩.৭ শতাংশ হতে পারে । অর্থাৎ সার্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার যতটা দেখাচ্ছে, ব্যক্তি পর্যায়ে আয় বৃদ্ধির গতি তার চেয়ে অনেকটাই কম—জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি মিলিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে বাড়তি আয়ের প্রকৃত সুফল সীমিত থেকে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সেভাবে বাড়ছে না, ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
টাকার অবমূল্যায়ন: মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি চাপ
মূল্যস্ফীতির পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো টাকার বিনিময় হারে ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন। চলতি বছরের মার্চ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক আগের হস্তক্ষেপ-নির্ভর নীতি থেকে সরে এসে টাকার একটি নিয়ন্ত্রিত, ধীরগতির অবমূল্যায়নের পথ বেছে নিয়েছে , মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির ওপর তৈরি হওয়া চাপ সামলাতে। এর ফলে মার্চের শুরুতে প্রতি ডলারে প্রায় ১২২.৩০ টাকায় স্থিতিশীল থাকা বিনিময় হার বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকায় দাঁড়ায় , এবং জুলাই ২০২৬ নাগাদ তা আরও বেড়ে প্রতি ডলারে প্রায় ১২৩.২৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত এক বছরে প্রায় ০.৭৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন ।
সাধারণত মুদ্রার অবমূল্যায়ন রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ায় ও রপ্তানিকারক এবং প্রবাসী আয়প্রবাহকে সহায়তা করে। কিন্তু এর নেতিবাচক দিকও আছে—আমদানি করা জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও শিল্প কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তা দেশের ভেতরে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়, যাকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন "বিনিময় হার মাধ্যমে মূল্য সংক্রমণ" (exchange-rate pass-through)। এডিবির প্রতিবেদনেও এই বিষয়টিকে ২০২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে টাকার মূল্যে পতন একদিকে যেমন রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের জন্য সহায়ক হতে পারে, তেমনি সাধারণ ভোক্তার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নতুন সরকারের সংস্কার এজেন্ডা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
এডিবি এর আগের (এপ্রিল ২০২৬) প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের পেছনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরেছিল। সে সময় বলা হয়েছিল, সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসায় ভোগ ও বিনিয়োগে পুনরুজ্জীবনের প্রতিফলন ঘটছে প্রবৃদ্ধির সংশোধিত চিত্রে । এডিবির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়াং সে সময় মন্তব্য করেছিলেন যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বাহ্যিক ও আর্থিক খাতের চাপের মুখোমুখি হলেও, নতুন সরকারের সংস্কার এজেন্ডা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়ানো, বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে ।
সবমিলিয়ে, জুলাই ২০২৬-এর সবশেষ পূর্বাভাস বলছে—স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হলেও, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চস্তরে থাকলেও, নতুন সরকারের সংস্কারমুখী নীতি ও স্থিতিশীল প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে ২০২৭ অর্থবছরে অর্থনীতি কিছুটা গতি ফিরে পাবে বলে এডিবি প্রত্যাশা করছে। তবে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সংস্কার অব্যাহত রাখাই হবে এই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার মূল চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: Asian Development Bank (ADB), Asian Development Outlook (ADO) July 2026 ও এপ্রিল ২০২৬; The Daily Star; The Business Standard
