লেখক: ফাইন্যান্স ভিশন :তারিখ: ২২ জানুয়ারী ২0২৬
বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ এবং বিশ্বায়নের স্বপ্ন, অন্যদিকে দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) উত্তেজনা। এই পরিস্থিতিতে অনেক রাষ্ট্রকেই একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে— জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়ন (Development), নাকি জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির (Defense) আধুনিকায়ন?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশই বাধ্য হয়ে উন্নয়নের বাজেটে কাটছাঁট করে সামরিক সামর্থ্য বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
১. ‘গানস ভার্সেস বাটার’ (Guns vs. Butter) দ্বন্দ্ব
অর্থনীতিতে একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব আছে— 'গানস ভার্সেস বাটার'। এর অর্থ হলো, একটি দেশের সীমিত সম্পদ দিয়ে সে কি যুদ্ধের সরঞ্জাম কিনবে (Guns), নাকি জনগণের জন্য খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে (Butter)? বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশগুলোকে 'গানস' বা সামরিক শক্তির দিকে বেশি ঝুঁকতে বাধ্য করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্যের লড়াই এই প্রবণতাকে আরও উসকে দিয়েছে।
২. উন্নয়নের সাথে আপস বা কম্প্রোমাইজ
যখন একটি দেশ তার বাজেটের বড় অংশ অত্যাধুনিক ড্রোন, মিসাইল সিস্টেম বা যুদ্ধবিমান কেনায় ব্যয় করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের গতি ধীর হয়ে যায়।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: নতুন স্কুল বা হাসপাতাল তৈরির চেয়ে সীমানা রক্ষা বা সাইবার সিকিউরিটি এখন অনেক দেশের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
- গবেষণা ও উদ্ভাবন: সামাজিক উন্নয়নের গবেষণার চেয়ে সামরিক প্রযুক্তির গবেষণায় বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে।
৩. ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা
কেন দেশগুলো উন্নয়নের সাথে আপস করছে? উত্তরটি হলো অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে "শান্তিকালীন সময়" বলে কিছু নেই; এটি এখন একটি নিরন্তর প্রতিযোগিতা।
- প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা।
- বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা।
- আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
এই কারণগুলো দেশগুলোকে বাধ্য করছে তাদের উন্নয়নমূলক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিছুটা কমিয়ে সামরিক খাতে অর্থায়ন বাড়াতে। কারণ, নিরাপত্তা না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।
৪. দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
সাময়িকভাবে সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, দীর্ঘ মেয়াদে উন্নয়নের সাথে এই আপস ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদি একটি দেশের মানবসম্পদ (শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে শুধুমাত্র উন্নত অস্ত্র দিয়ে সেই দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে টিকে থাকতে পারবে না।
আরও পড়ুন : ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি: "মাদার অফ অল ডিলস" বলে পরিচিত২০২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশ তাদের বাজেটে (বিশেষ করে সামরিক ও অবকাঠামো খাতে) বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। নিচে ২০২৬ সালের প্রাক্কলিত তথ্যের ভিত্তিতে একটি তালিকা দেওয়া হলো।
| দেশ | বাজেট বৃদ্ধির হার (২০২৬ প্রাক্কলন) | প্রধান ফোকাস এরিয়া (Focus Area) |
|---|---|---|
| ১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) | ৪.৫% বৃদ্ধি | প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও সাইবার প্রতিরক্ষা |
| ২. চীন (China) | ৭.২% বৃদ্ধি | পিএলএ (PLA) আধুনিকায়ন ও সাপ্লাই চেইন |
| ৩. রাশিয়া (Russia) | ২২% বৃদ্ধি | যুদ্ধকালীন অর্থনীতি ও সমরাস্ত্র উৎপাদন |
| ৪. ভারত (India) | ১১% বৃদ্ধি | দেশীয় উৎপাদন (Make in India) ও বর্ডার ইনফ্রাস্ট্রাকচার |
| ৫. পোল্যান্ড (Poland) | ১৮% বৃদ্ধি | আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ন্যাটোর (NATO) শক্তি বৃদ্ধি |
| ৬. জাপান (Japan) | ১৩.৫% বৃদ্ধি | পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা (Counter-strike capability) |
| ৭. জার্মানি (Germany) | ৮% বৃদ্ধি | ন্যাটোর প্রতিরক্ষা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন |
| ৮. সৌদি আরব (Saudi Arabia) | ৯% বৃদ্ধি | ভিশন ২০৩০ ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানীয়করণ |
| ৯. ফ্রান্স (France) | ৬.৫% বৃদ্ধি | পারমাণবিক সক্ষমতা ও মহাকাশ প্রতিরক্ষা |
| ১০. যুক্তরাজ্য (UK) | ৫% বৃদ্ধি | AUKUS প্রকল্প ও নৌ-শক্তি বৃদ্ধি |
উপসংহার
আজকের বিশ্বে ভূ-রাজনীতি আর অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক নয়, বরং প্রতিযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক শক্তি বাড়ানো এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জটি হলো এমন একটি ভারসাম্য (Balance) রক্ষা করা, যাতে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার উন্নয়ন পুরোপুরি থমকে না যায়। উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা—এই দুটির মধ্যে সঠিক সমন্বয়ই আগামী দিনে একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির পরিচয় দেবে।
