বাংলাদেশের অর্থনীতি: নিম্নমুখী কি সত্যিই?
হ্যাঁ, বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫ সালে একটি স্পষ্ট নিম্নমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে, বিশেষ করে জিডিপি বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার কারণে। তবে, এটি "ধস" বা সম্পূর্ণ পতন নয়—বরং রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন এবং স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়া। আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক মিশন অনুসারে, জিডিপি বৃদ্ধি ৩.৭% -এ নেমেছে (পূর্ববর্তী ৪.২% থেকে), কিন্তু ২০২৬ সালে ৫% -এ উন্নতির সম্ভাবনা আছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে, এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্নির্মাণ হচ্ছে। নীচে সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হলো (ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত)।
মূল অর্থনৈতিক সূচকসমূহ: এক নজরে
নিম্নলিখিত টেবিলে FY25 (২০২৪-২৫)-এর গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো দেখানো হলো। তথ্য IMF, বিশ্বব্যাঙ্ক এবং স্থানীয় সূত্র থেকে সংগ্রহিত।
| সূচক | FY25 মান (সাম্প্রতিক) | পূর্ববর্তী বছর (FY24) | ট্রেন্ড/টীকা |
|---|---|---|---|
| জিডিপি বৃদ্ধির হার | ৩.৭% - ৩.৮% | ৪.২% | নিম্নমুখী; রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উৎপাদন বিলম্ব। |
| মুদ্রাস্ফীতি (CPI) | ৮.২৯% (নভেম্বর) | ৯.৮% | উন্নতি; তবে এখনও উচ্চ। |
| বৈদেশিক রিজার্ভ | ৩২.৫৭ বিলিয়ন ডলার | ২৬.৭ বিলিয়ন ডলার | পুনরুদ্ধার; রেমিট্যান্সের সুবিধায়। |
| জনসাধারণের ঋণ (GDP-র %) | ৪০.১৩% | ৩৮.৫% | স্থিতিশীল কিন্তু কর আদায়ে চাপ। |
| বেকারত্ব হার | ৪.৭% | ৪.২% | সামান্য বৃদ্ধি; শিল্প খাতে কর্মসংস্থান হ্রাস। |
সূত্র: IMF (নভেম্বর ২০২৫), বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস।
জিডিপি বৃদ্ধির প্রবণতা: চার্ট
কেন নিম্নমুখী হচ্ছে? প্রধান কারণসমূহ
- রাজনৈতিক অস্থিরতা: ২০২৪-এর জন-অভ্যুত্থানের ফলে উৎপাদন বিলম্ব এবং অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
- বেসরকারি খাতের দুর্বলতা: বিনিয়োগ জিডিপির ২২-২৩% -এ স্থবির হয়ে আছে।
- ব্যাংকিং ও অবকাঠামো: খেলাপি ঋণ এবং গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
- বহিরাগত ঝুঁকি: বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ এবং আশার আলো
সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে বেশ কিছু কাজ করছে:
- মুদ্রা সংস্কার: বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর ফলে রিজার্ভ বাড়ছে।
- ব্যাংকিং সংস্কার: দুর্বল ব্যাঙ্কগুলো পুনর্গঠন এবং সংস্কারের উদ্যোগ।
- কর আদায় উন্নয়ন: রাজস্ব বোর্ডের ডিজিটালাইজেশন এবং নতুন নীতিমালা।
কেন নিম্নমুখী হচ্ছে? প্রধান কারণসমূহ
- রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা: রাজনৈতিক পরিবেশের অস্থিরতা সরাসরি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।
- বেসরকারি খাতের স্থবিরতা: ব্যবসায়ীদের আস্থার অভাব এবং নতুন প্রকল্পের অভাব।
- জ্বালানি সংকট: গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
- রপ্তানি হ্রাস: বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার মুখে গার্মেন্টস খাতে প্রত্যাশিত গতি না আসা।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান নিম্নমুখী প্রবণতা কাটিয়ে ওঠা কেবল অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান না ঘটবে এবং একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী সরকার প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।
বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য রাজনৈতিক নিশ্চয়তা খোঁজেন। একটি স্থায়ী সরকার ছাড়া নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, যা বেসরকারি খাতকে আরও দুর্বল করে দেয়। তাই অর্থনীতির চাকা সচল করতে হলে প্রথমে রাজনৈতিক সংকট নিরসন এবং একটি স্থিতিশীল প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।
তথ্যসূত্র: আইএমএফ (IMF), বিশ্বব্যাঙ্ক এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিবেদন।

