লেখক: ফাইন্যান্স ভিশন
তারিখ: ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫বিশ্ব অর্থনীতি কি সত্যিই কিছু নির্দিষ্ট স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে? সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, মুদ্রাস্ফীতি, ডলার নির্ভরতা ও উন্নয়নশীল দেশের উত্থান নতুন করে এই প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। অর্থনীতির নিয়ম বোঝার ক্ষেত্রে এখন “Economics Rule of Pillar” ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি আর একক শক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। বরং একাধিক অর্থনৈতিক স্তম্ভ বা “pillar” মিলেই বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই প্রেক্ষাপটেই Economics Rule of Pillar বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
Economics Rule of Pillar কী
Economics Rule of Pillar বলতে বোঝানো হয় এমন একটি ধারণা, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি কয়েকটি মূল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হয়। এই স্তম্ভগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত এবং একটি দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন, মুদ্রা ব্যবস্থা, বাণিজ্য কাঠামো, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—এই সব মিলেই অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ গড়ে ওঠে।
কেন এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে একের পর এক সংকট দেখা যাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং চাপ, যুদ্ধ ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। এই পরিস্থিতিতে কোন স্তম্ভ কতটা শক্তিশালী, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
Economics Rule of Pillar ধারণা নীতিনির্ধারকদের বুঝতে সাহায্য করে—কোন জায়গায় সংস্কার প্রয়োজন এবং কোন স্তম্ভে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত।
ঐতিহাসিক ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর IMF ও World Bank-এর মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামো গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে BRICS-এর মতো জোট এবং আঞ্চলিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নতুন স্তম্ভ হিসেবে উঠে আসছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করে তুলছে।
প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভগুলো কী কী
বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ হলো মুদ্রা ব্যবস্থা। ডলার দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করলেও এখন বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার আলোচনা জোরদার হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো বৈশ্বিক বাণিজ্য। মুক্ত বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
IMF ও বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর ভূমিকা
IMF দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি মূল স্তম্ভ। সংকটকালে ঋণ সহায়তা দিয়ে দেশগুলোর অর্থনীতি সামাল দিতে সাহায্য করে সংস্থাটি।
তবে IMF-এর কঠোর শর্ত ও পশ্চিমা প্রভাব নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে, যা বিকল্প স্তম্ভ তৈরির আলোচনা উসকে দিয়েছে।
BRICS ও নতুন অর্থনৈতিক স্তম্ভের উত্থান
BRICS দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়িয়ে নতুন স্তম্ভ গড়ার চেষ্টা করছে। New Development Bank ও স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এই উদ্যোগের অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, BRICS বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বদলাতে সক্ষম একটি নতুন স্তম্ভ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
Economics Rule of Pillar-এর লক্ষ্য ও সুবিধা
এই ধারণার মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে একক নির্ভরতা থেকে মুক্ত করা। একাধিক স্তম্ভ থাকলে সংকটের সময় ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়।
এতে উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী নীতি গ্রহণের সুযোগ পায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হয়।
চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
একাধিক অর্থনৈতিক স্তম্ভ থাকলে নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন জোট ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া নতুন স্তম্ভগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতেও সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভবিষ্যতে বিশ্ব ও ভারতের উপর প্রভাব
ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বহুমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। IMF, BRICS ও আঞ্চলিক শক্তি মিলেই নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সুযোগ। একাধিক অর্থনৈতিক স্তম্ভের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারত তার বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে পারে।
আরও পড়ুন : IMF-এর বিকল্প আর্থিক শক্তি হতে চলেছে BRICS? বদলাতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়মEconomics Rule of Pillar প্রসঙ্গে আলোচিত অর্থনীতিবিদরা
1. Joseph E. Stiglitz
Joseph E. Stiglitz একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন Chief Economist। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও উন্নয়নশীল দেশের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করে আসছেন।
Stiglitz একাধিকবার উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্ব অর্থনীতি যদি একক প্রতিষ্ঠান বা একক শক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা সহজেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প আর্থিক কাঠামো তৈরি করাকে তিনি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ Joseph Stiglitz-এর মতে, একাধিক অর্থনৈতিক স্তম্ভ থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই হয়।
2. Kenneth Rogoff
Kenneth Rogoff আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা IMF-এর প্রাক্তন Chief Economist হিসেবে কাজ করেছেন। বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থা ও আর্থিক সংকট নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
তিনি ডলার নির্ভরতা, ঋণ সংকট এবং বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর পরিবর্তনশীল ধারা নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন। Rogoff-এর মতে, দীর্ঘমেয়াদে একক মুদ্রা ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
IMF-এর প্রাক্তন মুখ্য অর্থনীতিবিদ Kenneth Rogoff মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে একক মুদ্রা ও একক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসছে।
3. Dani Rodrik
Dani Rodrik হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ। তিনি বৈশ্বিকায়ন, বাণিজ্যনীতি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করে আসছেন।
Rodrik তাঁর গবেষণায় “Globalization with limits” ধারণার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা আলাদা এবং সেই অনুযায়ী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্তম্ভ গড়ে তোলা জরুরি।
অর্থনীতিবিদ Dani Rodrik-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একাধিক নীতিগত ও আর্থিক স্তম্ভ থাকা ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
4. Nouriel Roubini
Nouriel Roubini একজন বিশ্বখ্যাত অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, যিনি “Dr. Doom” নামে পরিচিত। বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
তিনি debt trap, ব্যাংকিং ঝুঁকি এবং বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বল স্তম্ভগুলো নিয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। Roubini মনে করেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ভবিষ্যতের সংকট এড়ানো কঠিন।
Nouriel Roubini-এর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির কিছু স্তম্ভ অত্যন্ত চাপের মধ্যে রয়েছে, যা বিকল্প কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বাড়াচ্ছে।
5. Amartya Sen
Amartya Sen একজন নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, যিনি উন্নয়ন অর্থনীতি ও মানব কল্যাণ নিয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।
তিনি অর্থনীতিকে কেবল প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিতে নয়, বরং মানব উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর মতে, শক্তিশালী সমাজ ছাড়া শক্তিশালী অর্থনীতি সম্ভব নয়।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ Amartya Sen বরাবরই বলে এসেছেন, অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হওয়া উচিত মানব উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা।
.6. Raghuram Rajan
বিশিষ্ট ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও RBI-এর প্রাক্তন গভর্নর Raghuram Rajan একাধিক লেখায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি সীমিত আর্থিক স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁর মতে, অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ আর্থিক ঝুঁকি বাড়ায় এবং সংকটের সময় পুরো ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটেই একাধিক শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভের ধারণা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
একইভাবে ভারতের প্রাক্তন Chief Economic Adviser Arvind Subramanian মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভূমিকা বাড়ার ফলে IMF বা পশ্চিমা আর্থিক কাঠামোর পাশাপাশি নতুন স্তম্ভ তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই পরিবর্তন বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী ও বাস্তবমুখী করে তুলতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, Economics Rule of Pillar আসলে এই পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিফলন। একক শক্তির উপর নির্ভরতা কমিয়ে একাধিক আর্থিক ও নীতিগত স্তম্ভ গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে বড় সুযোগ।
শেষ কথা
Economics Rule of Pillar ধারণা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে বিশ্ব অর্থনীতি আর একক শক্তির হাতে নেই। একাধিক স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিয়ম গড়ে উঠছে। এই পরিবর্তন ধীর হলেও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে গভীর হতে পারে।
ভিডিও রেফারেন্স
পাঠকদের আরও স্পষ্ট ধারণার জন্য নিচে একটি প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণধর্মী ভিডিও রেফারেন্স হিসেবে দেওয়া হলো।
Economics, BRICS ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো — বিশ্লেষণ
FAQ
Economics Rule of Pillar বলতে কী বোঝায়?
এটি এমন একটি ধারণা যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি একাধিক প্রধান স্তম্ভের উপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়।
এই ধারণার সঙ্গে BRICS-এর সম্পর্ক কী?
BRICS একটি নতুন অর্থনৈতিক স্তম্ভ হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে চাইছে।
ভারতের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একাধিক অর্থনৈতিক স্তম্ভ থাকলে ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও সক্রিয় ও স্বাধীন ভূমিকা নিতে পারে।
