২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন শ্রম আইন, তাদের প্রভাব, সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: ২১ নভেম্বর, ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন শ্রম আইন, তাদের প্রভাব, সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সরকার ব্রিটিশ আমলের ২৯টি পুরনো শ্রম আইন একযোগে বাতিল করে ৪টি নতুন লেবার কোড কার্যকর করেছে। এই আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় প্রতিটি কোড, তাদের প্রভাব, সুবিধা ও ঝুঁকি এবং বিভিন্ন শ্রমী শ্রেণির ওপর পড়া সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
নতুন শ্রম আইন কেন প্রয়োজন ছিল?
ভারতের শ্রম আইনগুলো অনেকাংশেই শতবর্ষ পুরনো এবং একে-অপরের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। নানা সময়ে আলাদা আলাদা আইন হওয়ার কারণে নিয়োগকর্তা ও কর্মী—দুই ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি দেখা দিতে থাকে। ২৯টি আইনের জটিলতা কমিয়ে শ্রম সম্পর্ককে সহজ ও স্বচ্ছ করার উদ্দেশ্যেই সরকার চারটি কোড নিয়ে এসেছে।
ব্রিটিশ আমলের ২৯টি আইন বাতিল — কেন বড় পরিবর্তন?
পুরনো আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। নতুন কোডগুলোর মাধ্যমে নিয়মগুলো একীভূত করা হয়েছে, যাতে বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা ও শিল্প সম্পর্ক—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা আসে।
নতুন ৪টি লেবার কোড কী কী?
১. মজুরি কোড (Wage Code 2019)
মজুরি কোডের লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। এতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, সময়মতো বেতন প্রদান এবং সমান কাজের জন্য সমান বেতন—সবকিছু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
২. শিল্প সম্পর্ক কোড (Industrial Relations Code 2020)
শ্রমিক–কোম্পানির সম্পর্ক, ছাঁটাই, ধর্মঘট এবং ইউনিয়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই কোডটি প্রণীত। এক নজরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল—৩০০ কর্মী পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠানে সরকারের অনুমতি ছাড়া ছাঁটাই করা যাবে।
৩. সামাজিক নিরাপত্তা কোড (Social Security Code 2020)
PF, ESI, গ্র্যাচুইটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধাসহ সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়গুলো এই কোডে সংকলিত করা হয়েছে। গিগ ওয়ার্কার এবং প্ল্যাটফর্ম-ওয়ার্কারদের জন্যও বিশেষ বিধান রয়েছে।
৪. ওএসএইচ কোড (Occupational Safety, Health & Working Conditions Code 2020)
কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কাজের সময় এবং বিশেষ করে মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই কোডের উদ্দেশ্য। বিপজ্জনক কাজে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মূল পরিবর্তন — পয়েন্ট বাই পয়েন্ট
- জাতীয় ন্যূনতম মজুরি: আগে রাজ্যভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি থাকায় অসামঞ্জস্য দেখা যেত। নতুন বিধান অনুযায়ী দেশের জন্য একটি ‘ন্যাশনাল ফ্লোর’ নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কোনো শ্রমিকই ন্যূনতম মজুরির নিচে বেতন পাবে না।
- হাতে পাওয়া বেতন (Take Home Salary): নতুন নিয়মে বেসিক স্যালারি মোট বেতনের অন্তত ৫০% রাখতে হবে। এর ফলে PF কাটা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে রিটায়ারমেন্ট সঞ্চয় বাড়বে। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে কর্মীদের হাতে পাওয়া নগদ টাকা কিছুটা কমে যেতে পারে।
- কর্মী ছাঁটাই ও Layoff: আগে ১০০ জনের বেশি কর্মী থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাঁটাইয়ের জন্য সরকারি অনুমতি লাগত। এখন ৩০০ জন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান এবং এতে সরকারের অনুমতির বাধ্যবাধকতা নেই—এটি নিয়োগকর্তাদের জন্য সুবিধা, কিন্তু কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
- কাজের সময় ও ওভারটাইম: নিয়ম অনুসারে দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ বাধ্যতামূলক; বিশ্রামসহ সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ নির্ধারণ করা হয়েছে। সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না এবং ওভারটাইম করলে দ্বিগুণ হারে বেতন দিতে হবে।
- নারীদের কাজের শিফট: মহিলারা এখন নাইট শিফটেও কাজ করতে পারবেন; তবে কোম্পানিকে তাদের নিরাপত্তা, পরিবহন এবং অন্যান্য সঙ্গতিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
- ডিজিটালাইজেশন ও ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম: অফিসিয়াল রেজিস্ট্রেশন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার, বেতন রেকর্ড—সবকিছু ডিজিটালি সংরক্ষণ ও আপডেট করার নির্দেশ আছে। পাশাপাশি Work From Home-কে আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে শ্রমবাজারকে নমনীয় করবে।
Before vs After — সংক্ষিপ্ত তুলনা
| বিষয় | আগে | এখন |
|---|---|---|
| হাতে পাওয়া বেতন | বেসিক কম দেখিয়ে বেশি অ্যালাউন্স | বেসিক ≥50% → PF বাড়বে, হাতে কম |
| PF/Gratuity | কম জমা | জমা বাড়বে, রিটায়ারমেন্ট সুরক্ষা বাড়বে |
| Layoff | ১০০+ কর্মী → অনুমতি প্রয়োজন | ৩০০ পর্যন্ত অনুমতিহীন |
| গ্র্যাচুইটি | ৫ বছর ছক | ফিক্সড-টার্মে ১ বছরেই যোগ্যতা |
| কাজের সময় | কম ফ্লেক্সিবিলিটি | দিনে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত, সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা সীমা |
নতুন আইনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক
ইতিবাচক দিক
নতুন কোডগুলো অসংগঠিত খাতকে কাভার করবে, গিগ ওয়ার্কারদের সামাজিক নিরাপত্তা দেবে এবং সমান কাজের জন্য সমান বেতনের নীতিকে শক্ত করবে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনাল ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ দ্রুত সমাধান হবে—এই সব মিলিয়ে কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার দিকটি উল্লেখযোগ্য।
নেতিবাচক দিক ও ঝুঁকি
কিন্তু সব বিষয়ে ইতিবাচক নয়; Layoff-এর নিয়ম সহজ হওয়ায় চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ আছে। ইউনিয়নের ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হতে পারে এবং MSME-র ওপর PF, ডিজিটাল প্রক্রিয়া ইত্যাদি বজায় রাখার খরচ বাড়বে। এছাড়া হাতে বেতন কমে যাওয়াও তরুণ কর্মীদের জন্য সমস্যা হতে পারে।
কাদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
- ফিক্সড-টার্ম কর্মীরা: দ্রুত গ্র্যাচুইটি পাবেন, কিন্তু চুক্তি নবায়নে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
- গিগ-ওয়ার্কাররা: বিমা ও পেনশনের সুবিধা পাবে।
- নারী কর্মীরা: নাইট শিফটে কাজ করতে পারবেন—তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
- যুব কর্মীরা: ওভারটাইমে বেশি উপার্জন করতে পারলেও হাতে বেতন কমবে।
অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
লম্বা সময়ে এই কোডগুলি ভারতকে আধুনিক শ্রমবাজারে রূপান্তর করতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করবে। তবে MSME-র খরচ বাড়ার ফলে ছোট ব্যবসার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা আছে। সফল প্রয়োগ নির্ভর করবে রাজ্য পর্যায়ে বাস্তবায়নের গতিবেগ ও নিবিড় নজরদারির ওপর।
উপসংহার
নতুন ৪টি লেবার কোড ভারতের শ্রমজগতকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে করা হয়েছে—তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কিভাবে নিয়মগুলো মাঠে প্রয়োগ করা হবে। কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো এবং ব্যবসা করতে সহজতর করা—উভয় লক্ষ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তাদের মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্নোত্তর (FAQs)
১. নতুন শ্রম কোড কবে থেকে কার্যকর?
সরকারি ঘোষণানুযায়ী ২১ নভেম্বর, ২০২৫ থেকে নতুন কোডগুলো প্রযোজ্য হবে।
২. এই কোডে কি আমার হাতে বেতন কমে যাবে?
বেসিক স্যালারি বাড়ালে PF কাটা বাড়বে—ফলে হাতে পাওয়া নগদ কিছুটা কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে রিটায়ারমেন্ট সঞ্চয় বাড়বে।
৩. গিগ ওয়ার্কাররা কী সুবিধা পাবেন?
হ্যাঁ—গিগ ওয়ার্কারদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, বিমা ও কল্যাণ তহবিলের বিধান রাখা হয়েছে।
৪. নাইট শিফটে মহিলাদের কাজ করা কি নিরাপদ হবে?
আইন অনুযায়ী কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও পরিবহন নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। বাস্তবে এটি কিভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা নিরীক্ষা করা জরুরি।
৫. MSME-র কি অতিরিক্ত বোঝা পড়বে?
হ্যাঁ—নিরাপত্তা ব্যবস্থা, PF-সহ অন্যান্য ব্যয় বাড়তে পারে। সরকারি সহায়তা ও স্টিমুলাস ছাড়াই অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ পড়ার ইঙ্গিত রয়েছে।

