সুইজারল্যান্ডে বহুল আলোচিত করসংক্রান্ত গণভোটে, উত্তরাধিকার কর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা কি হল?
স্বাগতম। আজ আমরা নজর দিচ্ছি সুইজারল্যান্ডের বহুল আলোচিত সেই করসংক্রান্ত গণভোটে, যেখানে দেশজুড়ে বিতর্ক ছড়িয়ে দিয়েছে ৫০% ফেডারেল ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব।
এই কর আরোপ হলে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়ত।
কিন্তু সর্বশেষ সমীক্ষা বলছে—প্রস্তাবটি বিপুল ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হতে চলেছে।
এতে কী থাকবে সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বজুড়ে বিলিয়নেয়ারদের ভবিষ্যৎ ঠিকানা নির্বাচনে? চলুন খতিয়ে দেখি।
বর্তমান পরিস্থিতি: কেন এখনও ধনীদের জন্য স্বর্গ সুইজারল্যান্ড
সুইজারল্যান্ড বহুদিনই ধরেই পরিচিত কর–বান্ধব দেশ হিসেবে।
এ দেশের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—
- ফেডারেল স্তরে কোনো উত্তরাধিকার কর নেই।
- কর আরোপ হয় ক্যান্টনভিত্তিক নিয়মে, যেখানে অনেক ক্যান্টনে সন্তান বা স্বামী–স্ত্রীকে সম্পদ হস্তান্তরে করহার পুরোপুরি শূন্য।
উদাহরণস্বরূপ:
- Zug, Schwyz, Nidwalden— করহার ০%
- Geneva, Vaud— দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়দের জন্য ৭–১০%
এই বৈচিত্র্যই বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের জন্য সুইজারল্যান্ডকে করে তুলেছে সবচেয়ে সুবিধাজনক ঠিকানা।
প্রতিবছর প্রায় ১০০ জনেরও বেশি আল্ট্রা–রিচ ব্যক্তি নতুনভাবে সুইজারল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন।
UBS-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে থাকা UHNWIs (অত্যধিক ধনী ব্যক্তিদের) প্রতি ১০ জনের একজন এখন এ দেশেই থাকেন।
প্রস্তাবিত ৫০% উত্তরাধিকার কর—আসলে কী ছিল এতে?
প্রস্তাবিত আইন বলছিল—
- ১০ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁসের বেশি মূল্যের সম্পদে ৫০% ফেডারেল কর
- ক্যান্টনগুলোর বিশেষ কর নীতি বাতিল
- অতিরিক্ত আয় দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা তহবিল জোরদার
বাম দলগুলোর দাবি ছিল—ধনীদেরও সমাজে বড় অবদান রাখা উচিত।
কিন্তু ব্যবসায়ী সংগঠন, ফিনান্স সেক্টর এবং ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই বিরোধিতা শুরু হয়।
সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে—
- ৬০% এর বেশি ভোটার এই কর আরোপের বিরুদ্ধে।
তাদের মতে—এটি ক্যান্টনের স্বাধীনতা হরণ করবে এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেবে।
আরও পড়ুন এনভিডিয়া (Nvidia): এআই-এর বস যে আমেরিকার অর্থনীতিকে রকেট বানাচ্ছেকঠোর কর আরোপে কী ক্ষতি হতে পারত?
১. আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া
উচ্চ কর মানেই ধনী ব্যক্তিদের দেশত্যাগের ঝুঁকি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন—এ ধরনের কর আরোপ হলে অনেক UHNWIs মোনাকো, সিঙ্গাপুর বা দুবাইয়ে চলে যেতে পারেন। ফলে বিদেশি সম্পদ ২০% পর্যন্ত কমে যেতে পারত।
২. দ্বিগুণ করের অভিযোগ
ধনী ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে তাদের আয় থেকে নিয়মিত কর প্রদান করেন। এবার উত্তরাধিকার কর আরোপ করলে তা দ্বিগুণ কর হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মন্তব্য করেন ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞরা।
৩. পারিবারিক ব্যবসার উপর নেতিবাচক প্রভাব
সুইজারল্যান্ডের ৯৯% প্রতিষ্ঠানই পারিবারিক ব্যবসা।
উচ্চ কর আরোপ করলে:
- ব্যবসার মালিককে প্রতিষ্ঠান বিক্রি করতে হতে পারে
- কর্মসংস্থান কমে যাবে
- ক্ষুদ্র শিল্পে বাড়বে অর্থনৈতিক চাপ
অন্যদিকে সমালোচকদের যুক্তি—ধনী ব্যক্তিদের আরও অবদান রাখা উচিত
১. সরকারি ব্যয় বাড়ছে
বৃদ্ধভাতা, স্বাস্থ্যখাত, অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই আরও টাকার প্রয়োজন। তাদের মতে ধনীদের কম কর দেওয়া অসমতা বাড়াচ্ছে।
২. সম্পদ বৈষম্য বাড়ছে
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সম্পদ জমতে জমতে সমাজে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। কর আরোপ করলে এটি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
৩. ধনীরা দেশ ছাড়ে—এই ধারণা সব সময় সত্য নয়
PwC–এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে—বিশ্বের মাত্র ১০% ধনী ব্যক্তি শুধু করের কারণে দেশ পরিবর্তন করেন।
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হলে কী হতে পারে?
১. ব্যাংকিং সেক্টর আরও স্থিতিশীল হবে
যেহেতু বড় কোনো কর পরিবর্তন আসছে না, তাই—
- প্রাইভেট ব্যাংকিং সেবা আরও বাড়বে
- ফ্যামিলি অফিসের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে
- সুইস ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট বিশ্বে শীর্ষেই থাকবে
২. ক্যান্টনের স্বাধীনতা আরও জোরালো হবে
সুইস জনগণ বারবারই দেখিয়ে দিয়েছে—করনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে ক্যান্টন, ফেডারেল সরকার নয়।
৩. আন্তর্জাতিক অসন্তোষ বাড়তে পারে
বিশেষ করে জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে এই অভিযোগ বেশ প্রবল—তাদের ধনী নাগরিকরা সুইজারল্যান্ডে গিয়ে কর এড়িয়ে যান। অতএব, ভবিষ্যতে এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
শেষ কথা: বিলিয়নেয়ারদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সুইজারল্যান্ড আরও শক্ত অবস্থানে
৫০% উত্তরাধিকার করের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে বার্তা পরিষ্কার—সুইজারল্যান্ড এখনও ধনীবান্ধব কাঠামো ধরে রাখতে চায়। এতে বিদেশি ধনী নাগরিক, বিনিয়োগকারী ও ওয়েলথ ম্যানেজারদের আগমন আরও বাড়বে।
তবে সামাজিক ন্যায়বিচার, বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক কর চাপ নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকবে।
এখনও পর্যন্ত—সুইজারল্যান্ডে ধনীরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন।
