মেক্সিকো কেন ভারতের গাড়ির ওপর ট্যারিফ ২০% থেকে ৫০% করল – তার অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি ও ভারতের প্রতিক্রিয়া বিশদ বিশ্লেষণ
মেক্সিকো ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এমন একটি সিদ্ধান্ত চালু করতে যাচ্ছে যা সরাসরি ভারতের গাড়ি রপ্তানির ওপর বড় চাপ তৈরি করবে। ভারত থেকে মেক্সিকোতে গাড়ি পাঠানো কোম্পানিগুলিকে এতদিন প্রায় ২০% শুল্ক দিতে হত। কিন্তু নতুন নীতিতে সেটি বাড়িয়ে ৫০% করা হবে। ফলে ভারতের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার গাড়ি রপ্তানি বাজার ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এই সিদ্ধান্ত শুধু ট্যারিফ বাড়ানোর বিষয় নয়—এটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
কেন মেক্সিকো ট্যারিফ ২০% থেকে ৫০% করল?
১. স্থানীয় শিল্প রক্ষা (Protecting Domestic Industry)
মেক্সিকো বলেছে, তাদের স্থানীয় শিল্প, বিশেষ করে অটোমোবাইল, স্টিল, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক সেক্টর “অতিরিক্ত বিদেশি প্রতিযোগিতার” চাপে রয়েছে। তাই আমদানি করা গাড়ি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়াতে চাইছে যাতে—
- স্থানীয় গাড়ি প্রস্তুতকারকরা প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে পারে
- বিদেশি কমদামের গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমে
- স্থানীয় কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হয়
এই ধরনের সুরক্ষা নীতি (Protectionism) বর্তমানে বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে।
২. ভূ-রাজনৈতিক বার্তা: যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখা
যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ওয়াশিংটন বহুদিন ধরেই অভিযোগ করছে—এশিয়ার দেশগুলো (বিশেষত চীন) মেক্সিকো হয়ে মার্কিন বাজারে সস্তা পণ্য ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
মার্কিন চাপ বাড়ার পর মেক্সিকো দ্রুত আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক বসিয়েছে যাতে—
- যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে মেক্সিকো “ব্যাকডোর রুট” বন্ধ করতে আগ্রহী
- ২০২৬ সালের USMCA রিভিউ–এর আগে মেক্সিকো কোনও ঝুঁকি নিতে না চায়
- চীন, ভারত, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশের ওপর কঠোর অবস্থান দেখানো যায়
এই পদক্ষেপ তাই শুধু অর্থনীতি নয়, কূটনীতি হিসাবেও বড়সড় সংকেত।
৩. ভারতের ওপর এর সরাসরি প্রভাব
মেক্সিকো ভারতীয় গাড়ির অন্যতম বড় বাজার। টাটা, মারুতি সুজুকি, হুন্ডাই, নিসান—সবাই মেক্সিকোয় বিপুল পরিমাণ গাড়ি রপ্তানি করে থাকে।
নতুন শুল্কে—
- ভারতীয় গাড়ির দাম মেক্সিকোয় অনেক বেড়ে যাবে
- ভারতীয় গাড়ি স্থানীয় উৎপাদন বা অন্যান্য দেশের গাড়ির তুলনায় কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়বে
- অনেক কোম্পানিকে রপ্তানি কমাতে বা কৌশল বদলাতে হতে পারে
অটোমোবাইল কম্পোনেন্ট, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক—all sectors are now under tariff pressure.
ইন্ডাস্ট্রি লিডারদের মন্তব্য (QUOTES FROM INDUSTRY LEADERS)
১. সিয়াম (SIAM) প্রেসিডেন্ট – "এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় অটো ইন্ডাস্ট্রির ওপর অপ্রত্যাশিত চাপ তৈরি করবে"
আরও পড়ুন মার্কিন ট্যারিফ বাড়লেও ভারতীয় GDP অটুট — USA ‘shocked কেন ?SIAM প্রেসিডেন্ট বিনয় পাণ্ডে বলেছেন:
“মেক্সিকো ভারতীয় কমপ্যাক্ট কারের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ২০% থেকে হঠাৎ ৫০% শুল্ক হওয়া সরাসরি গাড়ির দাম বাড়াবে এবং রপ্তানির ওপর বড় ধাক্কা দেবে। আমাদের সরকার যেন অবিলম্বে কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি তোলে।”
2. ACMA (Automobile Component Manufacturers Association)
ACMA ডিরেক্টর দীপক কালরা বলেন—
“গাড়ির কম্পোনেন্ট রপ্তানির ক্ষেত্রেও মেক্সিকো গুরুত্বপূর্ণ। এত বেশি শুল্ক আমদানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত করবে। ভারতকে হয় ট্যারিফ ছাড় চাওয়ার জন্য আলোচনা করতে হবে, না হলে বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে।”
3. ভারতের অন্যতম রপ্তানিকারক অটো কোম্পানির এক শীর্ষ কর্তা
“আমরা গত পাঁচ বছর ধরে মেক্সিকোকে স্ট্র্যাটেজিক হাব হিসেবে ব্যবহার করেছি। ২০% শুল্ক manageable ছিল। কিন্তু ৫০% হলে আমাদের মডেলের দাম প্রতিযোগিতা হারাবে। আলোচনার দরকার আছে।”
মেক্সিকোর এই সিদ্ধান্তে ভারতের ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে?
- রপ্তানি আয় কমার ঝুঁকি: বড় কোম্পানিগুলোর রপ্তানি কমে যেতে পারে, যা ভারতের মোট অটো-রপ্তানিতে ক্ষতি করবে।
- ট্রেড নেগোশিয়েশন বা চাপের মুখে পড়তে হবে: ভারতকে এখন মেক্সিকোর সঙ্গে আলাদা ট্রেড আলোচনায় যেতে হবে। মেক্সিকো স্পষ্ট জানিয়েছে—যাদের সঙ্গে FTA নেই তারা সবাই “উচ্চ শুল্ক” দেবে।
- ভারতকে হয় WTO নয়তো FTA—দুইয়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: WTO অভিযোগ বা ভবিষ্যতে bilateral FTA নিয়ে আলোচনা—দুটিই সময়সাপেক্ষ। কিন্তু চাপ বাড়ছে।
ভারত কী কী নীতি বিকল্প (Policy Options) নিতে পারে?
এখানে ভারতের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পথ খোলা আছে—
OPTION 1: মেক্সিকোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা (Bilateral Negotiation)
ভারত সরকারের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে আলোচনার টেবিলে বসা।
- নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির গাড়িতে শুল্ক ছাড়
- কমপ্যাক্ট এবং বাজেট কারের জন্য আলাদা ট্যারিফ ব্যান্ড
- ধাপে ধাপে শুল্ক বৃদ্ধি না করে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ চাওয়া
এই ধরণের আলোচনায় দু’দেশের বাণিজ্য মন্ত্রক যুক্ত হতে পারে।
OPTION 2: WTO–তে আপত্তি জানানো (Formal Trade Dispute)
যদি ভারত মনে করে শুল্ক বৃদ্ধি “অতিরিক্ত” এবং “অন্যায়”—
তাহলে WTO–র ‘Dispute Settlement Body’-তে মামলা করতে পারে।
এতে—
- আন্তর্জাতিক নজর আসবে
- মেক্সিকোকে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে
সময় লাগবে কিন্তু চাপ তৈরি হবে।
OPTION 3: প্রতিশোধমূলক শুল্ক (Retaliatory Tariffs)
ভারত চাইলে মেক্সিকো থেকে আমদানি হওয়া কিছু পণ্যের ওপর “Counter Tariff” বসাতে পারে।
এটি আলোচনা দ্রুত এগোতে সাহায্য করে, কিন্তু সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
OPTION 4: বিকল্প বাজার তৈরি (Diversification Strategy)
ভারত ইতিমধ্যে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে গাড়ি রপ্তানি বাড়াচ্ছে।
মেক্সিকোর ক্ষতি সামাল দিতে ভারত নতুন বাজারে—
- কমপ্যাক্ট কার
- EV (Electric Vehicles)
- বাজেট সেডান
এই তিনসেগমেন্টে বড় ঝাঁপ দিতে পারে।
OPTION 5: মেক্সিকোয় স্থানীয় অ্যাসেম্বলি ইউনিট তৈরি (Local Assembly Route)
যদি শুল্ক না কমে, কয়েকটি বড় কোম্পানি মেক্সিকোতেই—
- CKD/SKD অ্যাসেম্বলি
- Local partnership
—করে রপ্তানি রুট বদলাতে পারে।
এটি সময়সাপেক্ষ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর।
উপসংহার
মেক্সিকোর সিদ্ধান্ত ভারতীয় অটো রপ্তানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু এটি একইসঙ্গে ভারতের কূটনীতি, গ্লোবাল ট্রেড স্ট্র্যাটেজি, এবং রপ্তানি বৈচিত্রকরণ নিয়ে নতুন ভাবনার সুযোগও তৈরি করছে।
ভারত যদি কৌশলগতভাবে আলোচনা, WTO রুট এবং বাজার বৈচিত্রকরণকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে—
তাহলে এই সংকটকে ভবিষ্যতের রপ্তানি সম্প্রসারণে রূপান্তর করা সম্ভব।
