ভুয়ো করছাড় স্কিমের বিরুদ্ধে সরকারের কড়া পদক্ষেপ: করদাতাদের জন্য সচেতন থাকার সময় এখনই

ফাইন্যান্স ভিশন
By -
0
ভুয়ো করছাড় স্কিমের বিরুদ্ধে সরকারের কড়া পদক্ষেপ: করদাতাদের জন্য সচেতন থাকার সময় এখনই
ভুয়ো করছাড় স্কিমের বিরুদ্ধে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্

ভারতের কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়ো করছাড় স্কিমের বিরুদ্ধে যে কঠোর অভিযান শুরু করেছে, তা সাধারণ করদাতাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বার্তা বহন করে। আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, আয়কর বিভাগ এখন আর শুধু কাগজে-কলমে নির্ভর করছে না; বরং আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রতিটি রিটার্ন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এর ফলে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজান্তে ভুয়ো ডিডাকশন দাবি করছেন, তারা দ্রুত নজরে চলে আসছেন।

এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হল সেই সব ভুয়ো দান ও মিথ্যা করছাড় স্কিম, যেগুলোর মাধ্যমে বহু করদাতা অযোগ্য সুবিধা নিচ্ছিলেন। বিশেষ করে 80G দানের নামে জাল রসিদ, অতিরঞ্জিত 80C ও 80D দাবি, এবং কৃত্রিমভাবে আয় কম দেখানোর প্রবণতা সরকারের নজরে এসেছে। আমরা লক্ষ্য করছি, অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী বা তথাকথিত ট্যাক্স এজেন্টরা করদাতাদের বড় রিফান্ডের লোভ দেখিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করেছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে—ভুল দাবি শুধরে না নিলে ভবিষ্যতে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।

সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে, সেগুলো শুধু শাস্তিমূলক নয়, বরং করদাতাদের সতর্ক করার উদ্দেশ্যেও নেওয়া হচ্ছে। সন্দেহজনক রিটার্নের ক্ষেত্রে SMS ও ইমেলের মাধ্যমে সতর্কবার্তা, স্বেচ্ছায় রিভাইজড রিটার্ন দাখিলের সুযোগ, এবং একাধিক শহরে একসঙ্গে যাচাই অভিযান—সব মিলিয়ে এটি একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ। আমরা এটাও দেখছি যে, যেসব কেসে সন্দেহ রয়েছে, সেগুলোর রিফান্ড ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর করা হচ্ছে, যাতে যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও ভুল অর্থ ফেরত না যায়।

এই অভিযান এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ একটাই—ভুয়ো করছাড় শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করে না, বরং সৎ করদাতাদেরও সমস্যায় ফেলে। যখন কেউ ভুয়ো দাবি করে, তখন পুরো সিস্টেমের ওপর চাপ পড়ে এবং প্রকৃত করদাতার রিফান্ডও দেরি হয়। আমরা বুঝতে পারছি, সরকার আসলে কর ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতেই এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

ভুয়ো দাবির প্রধান ক্ষেত্র: সরকারের নজরে এখন কী?

কিছু ITR ফাইলার ও এজেন্ট কমিশনের বিনিময়ে ভুয়ো ডিডাকশন দেখিয়ে রিটার্ন দাখিল করছে। এতে করদাতা অজান্তেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন।

অতিরঞ্জিত রিফান্ড দাবি

বহুজাতিক সংস্থা, PSU এবং সরকারি দপ্তরের বহু বেতনভোগী কর্মচারীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে—

  • 80C ও 80D–তে বাস্তব বিনিয়োগের তুলনায় অনেক বেশি দাবি
  • মেডিক্যাল বা ইন্স্যুরেন্স দাবিতে অসামঞ্জস্য

ভুল ছাড় ও এক্সেম্পশনের অপব্যবহার

  • ভুয়ো TDS এন্ট্রি
  • জাল নথি ব্যবহার করে করযোগ্য আয় কৃত্রিমভাবে কমানো

AI ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে নজরদারি

বর্তমানে CBDT উন্নত AI-ড্রিভেন ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে—

  • AIS ও TIS ডেটা মিলিয়ে দেখা
  • অস্বাভাবিক প্যাটার্ন চিহ্নিত
  • সন্দেহজনক রিটার্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্ল্যাগ করা

সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে

এই ভুয়ো করছাড় স্কিম দমনে প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সুসংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর।

  • SMS ও ইমেল অ্যালার্ট: যেসব রিটার্নে সন্দেহজনক ডিডাকশন দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট করদাতাদের তাৎক্ষণিক নোটিস ও অ্যালার্ট পাঠানো হচ্ছে।
  • স্বেচ্ছায় রিটার্ন সংশোধনের সুযোগ: জরিমানা বা মামলার আগে করদাতাদের রিভাইজড রিটার্ন ফাইল করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
  • বৃহৎ যাচাই অভিযান: একাধিক শহরে একসঙ্গে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন ড্রাইভ চালানো হচ্ছে।
  • মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: যেসব এজেন্ট বা প্রতিষ্ঠান ভুয়ো দাবি করাতে সাহায্য করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
  • ফ্ল্যাগড কেসে রিফান্ড স্থগিত: যতক্ষণ না যাচাই সম্পূর্ণ হচ্ছে, ততক্ষণ রিফান্ড প্রসেস ধীর বা স্থগিত রাখা হচ্ছে।

এই বছর কীভাবে সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্ট থাকবেন

এই প্রেক্ষাপটে, এই বছর কর রিটার্ন দাখিল করার সময় আমাদের প্রত্যেকেরই আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

১. প্রতিটি ডিডাকশনের জন্য সঠিক ডকুমেন্ট রাখুন

  • বৈধ দান রসিদ: ট্রাস্টের PAN, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, প্রযোজ্য সেকশন (80G)
  • মেডিক্যাল ও ইন্স্যুরেন্স প্রুফ: প্রিমিয়াম রসিদ, পলিসি ডকুমেন্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট
  • ইনভেস্টমেন্ট প্রুফ: ELSS AMC স্টেটমেন্ট, PPF পাসবুক, NPS ট্রানজ্যাকশন হিস্ট্রি
  • HRA দাবির ক্ষেত্রে: ভাড়া চুক্তি, ভাড়া রসিদ (নির্দিষ্ট পরিমাণের উপরে বাড়িওয়ালার PAN বাধ্যতামূলক)
  • ২. AIS ও TIS–এর সঙ্গে সব তথ্য মিলিয়ে নিন (বাধ্যতামূলক)

    বর্তমানে AIS (Annual Information Statement) ও TIS (Taxpayer Information Summary) হল আয়কর বিভাগের প্রধান যাচাইয়ের হাতিয়ার।

    AIS/TIS যাচাই করার ধাপে ধাপে পদ্ধতি:

    1. ধাপ ১: আয়কর পোর্টালে লগইন করে Services → AIS/TIS এ যান।
    2. ধাপ ২: Salary, Interest, Dividend, Capital Gains সহ আয়ের প্রতিটি ক্যাটাগরি যাচাই করুন।
    3. ধাপ ৩: TDS এন্ট্রি Form 26AS–এর সঙ্গে তুলনা করুন।
    4. ধাপ ৪: ভুল থাকলে দ্রুত AIS Feedback অপশন ব্যবহার করুন।
    5. ধাপ ৫: রিটার্ন ফাইল করার সময় TIS ভ্যালুই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করুন।
    আরও পড়ুন : ITR ২০২৫: করদাতাদের বড় স্বস্তি! নতুন ITR ফর্ম আসছে ২০২৭-২৮ সালের আগেই, জানাল সরকার

    ৩. বড় রিফান্ডের লোভে পড়বেন না

    বড় রিফান্ডের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এজেন্টদের থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রমাণ ছাড়া কোনও ডিডাকশন দাবি করবেন না এবং ভুয়ো দান রসিদ থেকে দূরে থাকুন। আজ হোক বা কাল, এই ভুল ধরা পড়বেই।

    ৪. যে ডিডাকশনগুলো সবচেয়ে বেশি স্ক্রুটিনিতে পড়ে

    এই সেকশনগুলিতে বিশেষ সতর্ক থাকুন:

    • আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক 80G দান
    • বিল ছাড়া মেডিক্যাল দাবি (80D)
    • ভাড়া চুক্তি ছাড়া HR.A.
    • HRA ও Home Loan একসঙ্গে দাবি
    • সবশেষে আমরা বলব, বর্তমান কর ব্যবস্থায় সচেতনতা ও কমপ্লায়েন্সই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। আজ একটু সময় নিয়ে নথি যাচাই করলে, ভবিষ্যতে অনেক বড় ঝামেলা থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়।

    আমাদের সাথে থাকুন! এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী খবর জানতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default