সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এবং ব্যবসা-বান্ধব দেশ, এবং এর পেছনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর সুসংগঠিত ও দক্ষ কর ব্যবস্থা। একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও, সিঙ্গাপুর বিশ্ব বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ফিনান্স সেক্টরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এই নিবন্ধে, আমরা সিঙ্গাপুরের কর ব্যবস্থার একটি শিক্ষাগত বিশ্লেষণ করবো, যা ছাত্র, বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসার জন্য সমানভাবে উপযোগী।
সিঙ্গাপুর ট্যাক্স সিস্টেম: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
সিঙ্গাপুরের কর কাঠামো সাধারণ, স্বচ্ছ এবং বিনিয়োগ-বান্ধব। দেশের কর নীতি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং বিদেশী বিনিয়োগকারী উভয়ই সমানভাবে উপকৃত হন।
মূলত, সিঙ্গাপুরে দুই ধরনের কর রয়েছে:
- প্রত্যক্ষ কর (Direct Tax): উদাহরণস্বরূপ, আয়কর, কর্পোরেট কর ইত্যাদি।
- পরোক্ষ কর (Indirect Tax): উদাহরণস্বরূপ, জিএসটি (Goods and Services Tax), কাস্টমস ডিউটি ইত্যাদি।
ব্যক্তিগত আয়কর
সিঙ্গাপুরে ব্যক্তিগত আয়কর ব্যবস্থা প্রগতিশীল (progressive), অর্থাৎ আয়ের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে করের হারও বৃদ্ধি পায়।
করের হার (অর্থবর্ষ ২০২৫ অনুযায়ী):
| বার্ষিক আয় (SGD) | করের হার (%) |
|---|---|
| 0 – 20,000 | 0% |
| 20,001 – 30,000 | 2% |
| 30,001 – 40,000 | 3.5% |
| 40,001 – 80,000 | 7% |
| 80,001 – 120,000 | 11.5% |
| 120,001 – 160,000 | 15% |
| 160,001 – 320,000 | 18% |
| 320,001 এবং তদূর্ধ্ব | 22% |
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিঙ্গাপুরে শুধুমাত্র স্থানীয় উৎস থেকে অর্জিত আয়ের উপর কর আরোপযোগ্য, অর্থাৎ বিদেশ থেকে আসা আয় বা লভ্যাংশের উপর সাধারণত কোনো কর আরোপ করা হয় না (যদি তা দেশে আনা না হয়)।
কর্পোরেট ট্যাক্স: ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির মেরুদণ্ড
সিঙ্গাপুরে বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক কর্পোরেট ট্যাক্স সিস্টেম রয়েছে।
বর্তমান কর্পোরেট ট্যাক্স রেট: ১৭%
তবে, বাস্তবে, কার্যকরী করের হার (effective tax rate) আরও অনেক কম, কারণ সরকার বিভিন্ন কর ছাড় এবং প্রণোদনা প্রদান করে।
প্রধান কর ছাড় এবং প্রণোদনা:
- আংশিক কর ছাড় (Partial Tax Exemption): করযোগ্য আয়ের প্রথম SGD 200,000-এর একটি বড় অংশ করমুক্ত বা খুব কম হারে কর ধার্য করা হয়।
- স্টার্ট-আপ ট্যাক্স ছাড় স্কিম (SUTE): নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথম তিন বছরে উল্লেখযোগ্য কর ছাড় উপভোগ করে।
- শিল্প-নির্দিষ্ট প্রণোদনা: প্রযুক্তি, বায়োটেক এবং আর্থিক পরিষেবা খাত সহ অন্যান্য খাতগুলি বিশেষ কর ছাড় পায়।
এই নীতিগুলি সিঙ্গাপুরকে এশিয়ার স্টার্টআপ এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলির হাবে পরিণত করেছে।
পণ্য ও পরিষেবা কর (GST)
সিঙ্গাপুরে, জিএসটি একটি অপরিহার্য পরোক্ষ কর যা বর্তমানে ৯% (২০২৪ সাল থেকে) নির্ধারণ করা হয়েছে।
এটি পণ্য ও পরিষেবার মূল্যের সাথে যোগ করা হয়, এবং শেষ ভোক্তা (end consumer) এই খরচ বহন করে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- ছোট ব্যবসাগুলির জন্য জিএসটি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয় যদি তাদের বার্ষিক টার্নওভার SGD ১ মিলিয়নের কম হয়।
- রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক পরিষেবাগুলি সাধারণত শূন্য-হারযুক্ত (0%) হয়, যা বৈদেশিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করে।
মূলধন লাভ এবং উত্তরাধিকার কর: বিনিয়োগকারী-বান্ধব নীতি
সিঙ্গাপুরে কোনো মূলধন লাভ কর (Capital Gains Tax) নেই। অর্থাৎ, শেয়ার, সম্পত্তি বা ব্যবসা বিক্রি থেকে অর্জিত লাভের উপর কোনো কর আরোপ করা হয় না।
এছাড়া, উত্তরাধিকার কর (Inheritance Tax) বা এস্টেট ডিউটি ২০০৮ সালে বাতিল করা হয়েছে, ফলে পারিবারিক সম্পদ হস্তান্তর প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়েছে।
এই উভয় সিদ্ধান্ত সিঙ্গাপুরকে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।
দ্বৈত কর চুক্তি (DTA): আন্তর্জাতিক আয় সুরক্ষা
সিঙ্গাপুর বিশ্বব্যাপী ৮০টিরও বেশি দেশের সাথে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি (DTAs) স্বাক্ষর করেছে।
এর ফলে, কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে একই আয়ের উপর দুটি ভিন্ন দেশে কর দিতে হয় না।
এটি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা, কারণ তারা কম বা শূন্য অতিরিক্ত করের ঝুঁকিতে তাদের মুনাফা সিঙ্গাপুরে আনতে পারে।
শিক্ষা ও গবেষণায় কর সুবিধা
সিঙ্গাপুর সরকার শিক্ষা এবং উদ্ভাবনের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ট্যাক্স ইনসেনটিভ স্কিমের মাধ্যমে, কোম্পানিগুলি তাদের R&D ব্যয়ের উপর ২৫০% পর্যন্ত কর ছাড় পেতে পারে।
এছাড়াও, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (SDF) এবং ট্রেনিং গ্রান্ট কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
সিঙ্গাপুরের কর প্রশাসন এবং স্বচ্ছতা
সিঙ্গাপুরের কর প্রশাসন ইনল্যান্ড রেভিনিউ অথরিটি অফ সিঙ্গাপুর (IRAS) দ্বারা পরিচালিত হয়।
এই সংস্থাটি ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে কর ফাইলিং, রিফান্ড এবং অডিট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
ডিজিটাল ট্যাক্স ফাইলিং সিস্টেমের সুবিধা:
- অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সহজেই কর ফাইল করা যায়।
- রিয়েল-টাইম গণনা এবং ই-রিসিপ্ট পাওয়া যায়।
- ব্যবসার জন্য স্বয়ংক্রিয় কমপ্লায়েন্স টুল উপলব্ধ।
এই আধুনিক ডিজিটাল পরিকাঠামো সিঙ্গাপুরের কর ব্যবস্থাকে দক্ষ, স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত করেছে।
২. সবুজ অর্থনীতির জন্য কর প্রণোদনা (Green Tax Incentives)
সিঙ্গাপুর তার জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে দায়িত্ব বাড়াচ্ছে।
সরকার এখন সেই কোম্পানিগুলিকে করমুক্তি দিচ্ছে যারা-
- কার্বন নিঃসরণ কমায়,
- নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে,
- পরিবেশ-বন্ধু উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
কার্বন কর বর্তমানে প্রতি টন কার্বন নির্গমনে S$25,যা ২০২৬ সালের মধ্যে S$45 পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এটির মূল উদ্দেশ্য হল টেকসই উন্নয়ন ও সবুজ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা।
৩. ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার (SME)জন্য কর সহায়তা
সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে SME বা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার তাই S.M.E. গুলোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কর লাভ সুবিধা চালু করেছে:
- কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স রিবেট (CITR): ২০% পর্যন্ত কর হার এ রেহাই।
- পণ্যতা ও উদ্ভাবন ক্রেডিট (PIC)স্কিম: প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ করলে ৪০০% পর্যন্ত কর ছাড়।
- ডিজিটাল রূপান্তর সমর্থন (DTS): ডিজিটাল টুল, সফটওয়্যার এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগে অতিরিক্ত কর সুবিধা।
এসকল স্কিমের ফলে SME সেক্টর আরো প্রতিযোগিতামূলক ও উদ্ভাবনী হয়ে উঠেছে।
সিঙ্গাপুরের ট্যাক্স সিস্টেম বনাম অন্য দেশগুলো
সিঙ্গাপুরের কর ব্যবস্থা বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্বের অন্যান্য আর্থ-ব্যবস্থার তুলনায় অগ্রগামী। নিচে একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলোঃ
| দেশ | কর্পোরেট ট্যাক্স হার | ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স | জিএসটি/ভ্যাট হার | ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স |
|---|---|---|---|---|
| সিঙ্গাপুর | 17% | নেই | 9% | নেই |
| ভারত | 25% | আছে | 18% | আছে |
| যুক্তরাজ্য | 25% | আছে | 20% | আছে |
| জাপান | 30% | আছে | 10% | আছে |
| হংকং | 16.5% | নেই | 0% | নেই |
এই তুলনায় সিঙ্গাপুর তার কম কর হার, সহজ প্রক্রিয়া ও স্থিতিশীল অর্থনীতি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ আকর্ষণীয় করে তোলে।
সিঙ্গাপুর ট্যাক্স সিস্টেমে প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি
সিঙ্গাপুর সরকার 'স্মার্ট নেশন' উদ্যোগের অংশ হিসেবে কর প্রশাসনকে ডিজিটালাইজড করেছে।
IRAS এখন ট্যাক্স প্রসেসিং এবং ভেরিফিকেশনের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ব্লকচেইন এবং ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবহার করছে।
এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুবিধা:
- ফাইলিং এবং রিফান্ড প্রক্রিয়া অনেক দ্রুততর হয়েছে।
- জালিয়াতি এবং ভুলের সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে।
- ব্যবসাগুলি রিয়েল-টাইম ট্যাক্স রেকর্ড অ্যাক্সেস করতে পারে।
এর ফলে, সিঙ্গাপুরের কর ব্যবস্থা এখন বিশ্বের অন্যতম স্মার্ট এবং দক্ষ প্রশাসনিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিক্ষা ও পেশায় সিঙ্গাপুর ট্যাক্স সিস্টেমের গুরুত্ব
সিঙ্গাপুরের কর ব্যবস্থা অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার ক্ষেত্র।
এটি কেবল কর আইন নয়, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক কৌশল, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রতিফলন।
একাডেমিক এবং পেশাদার দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব:
- আন্তর্জাতিক কর নীতির বিশ্লেষণে এটি একটি রেফারেন্স মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলির জন্য আর্থিক পরিকল্পনার ভিত্তি।
- বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মূল দিকনির্দেশনা।
উপসংহার: সিঙ্গাপুর ট্যাক্স সিস্টেম - একটি বিশ্বব্যাপী শিক্ষাগত মডেল
সিঙ্গাপুরের কর ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে কম করের হার অগত্যা রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয় না, বরং এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করার একটি উপায়।
সরকারের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট – এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে ব্যবসা, শিক্ষা এবং প্রযুক্তি একে অপরের পরিপূরক।
আজ, সিঙ্গাপুরের কর ব্যবস্থা কেবল একটি আর্থিক কাঠামো নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি, যা থেকে শেখা যায় কিভাবে কর নীতির মাধ্যমে একটি দেশকে বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
দাবিত্যাগ (Disclaimer): এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত। এটি কোনো ট্যাক্স, আইনি বা বিনিয়োগ পরামর্শ নয়। বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনার দেশের ট্যাক্স বিশেষজ্ঞ বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের পরামর্শ নিন।
