ভারতীয় শেয়ারবাজারে ১৫ অক্টোবর এক মজবুত প্রত্যাবর্তন দেখা গেছে। সেইদিন Sensex ৫৭৫ পয়েন্ট বেড়ে ৮২,৬০৫.৪৩ পয়েন্টে বন্ধ হয়। অন্যদিকে Nifty ২৫,৩০০ পয়েন্টের গণ্ডি অতিক্রম করে বাজারে ইতিবাচক সাড়া ফেলে দেয়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেল প্রচুর, কারণ মার্কেটের প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। এই র্যালির পেছনে কড়া কৌশলগত উপাদান থাকে যা আমরা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করবো।
বাজার পুনরুত্থান ও প্রধান সূচক
Sensex এবং Nifty—ভারতের দুটি শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক। Sensex অর্থাৎ Bombay Stock Exchange-এর ৩০টি শীর্ষ কোম্পানির মূল্য পরিবর্তন নির্দেশ করে। অন্যদিকে Nifty India’s National Stock Exchange-এর ৫০টি শীর্ষ কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত। ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয়ার্ধে চালিত ক্রয়-বিক্রয় লেনদেনে উভয় সূচকই আকর্ষণীয় অঙ্কে বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ার্ধে আয়োজিত লেনদেনের ফলে বাজারে দৃঢ় আস্থা ফেরে।
উত্থানের প্রধান কারণ
বাজারের এই শক্তিশালী র্যালির পেছনে কয়েকটি মুখ্য কারণ রয়েছে:
- মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নরম (dovish) মনোভাব
- বৈশ্বিক টানাপোড়েন কমে যাওয়া
- আর্থিক ও রিয়েল এস্টেট সেক্টরে চমৎকার ফলাফল
- অবকাঠামোগত খাতে স্বস্তিদায়ক উন্নতি
- বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক মনোভাব
এই উপাদানগুলো একত্রে কাজ করে বাজারে ক্রমশ বাড়তি ক্রয় চাপ তৈরি করে।
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের মনোভাব
বিশ্ব অর্থনীতির ঘড়ি হিসেবে বিবেচিত মার্কিন ফেডের নরম মনোভাব বাজারে সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ফেডের সতর্ক ভাষ্য ও সুদের হার স্থিতিশীল রাখার সংকেত বাজারে মূলধন প্রবাহ আরও মজবুত করেছে। ভারতীয় শেয়ারবাজার সেই প্রবাহের সুবিধা গ্রহণ করেছে।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনার মাত্রা সামান্য অবনতির মুখোমুখি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন সংকট সমাধানের আশায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও তেলদর স্থিতিশীল হয়েছে। এই পরিস্থিতি ঝুঁকি-হীন সম্পদের চাহিদা কমিয়ে বাজারে স্বস্তি আনে। বিনিয়োগকারীরা পুনরায় বাজারে ধনরাশি সঞ্চয় শুরু করেছে, ফলে উন্নয়নশীল সূচকগুলো অগ্রগতির পথে অটল রয়েছে।
আর্থিক খাতের পারফরম্যান্স
আর্থিক খাত Sensex এবং Nifty উভয় সূচকেই সর্বাধিক অবদান রেখেছে। ব্যাংক, NBFC, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শেয়ারগুলো দিনের লেনদেনে চমৎকার ফল দেখিয়েছে। ঋণদানের ব্যয় কমার পাশাপাশি সুদের মার্জিন বাড়ায় আয়ের প্রবাহ বিকশিত হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আর্থিক খাতে আস্থা রাখছে।
রিয়েল এস্টেট খাতের ভূমিকা
রিয়েল এস্টেট সেক্টরের শেয়ারগুলোও লেনদেনে সাড়া ফেলে দিয়েছে। ভোক্তা চাহিদায় পুনরুজ্জীবন ঘটায় আবাসিক ও কমার্শিয়াল প্রকল্পগুলো ত্বরান্বিত বিক্রি পেয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের ইতিবাচক ঘোষণা রিয়েল এস্টেট প্লেয়ারদের শেয়ার দর বাড়িয়েছে। সরকারী প্রকল্প ঘোষণা বিনিয়োগ আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে।
অবকাঠামো খাতে ইতিবাচক অঙ্গীকার
সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক অর্থায়ন এবং নীতি ঘোষণা করেছে। সড়ক, রেল, বন্দরের কাজগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এয়ারপোর্ট এক্সপ্যানশন এবং স্মার্ট সিটি মিশনের ফলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলো টপ-গেনার্সের তালিকায় উঠে এসেছে, যা বাজারে স্থায়িত্ব আনে।
মুদ্রানীতি ও প্রবৃদ্ধি
ভারতের মুদ্রানীতি রেপো রেট স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি ব্যাঙ্কগুলোর অতিরিক্ত তরলতা অব্যাহত রেখেছে। ঋণদানের প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে ছোট ও মাঝারি শিল্পে সুলভ ঋণ প্রদানের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক সিগন্যাল দিয়েছে। সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি বাজারের সুস্থ প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
প্রযুক্তি খাতে স্বল্প পরিব্যাহত দৃশ্য
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সামান্য মৃদু অবস্থান দেখা গেল। আন্তর্জাতিক রপ্তানি আয় সংকোচনের ফলে কিছু ইটি প্লেয়ারের শেয়ার মূল্য চাপের মুখে পড়েছে। তবে দেশীয় ডিজিটাল সম্পদ, ক্লাউড এবং সাইবার সিকিউরিটি সেবার চাহিদি প্রযুক্তি খাতকে সহায়তা করেছে। সরকারী ডিজিটালাইজেশন প্রকল্প ভবিষ্যতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
বিশ্লেষক দৃঢ়মত
বাজার বিশেষজ্ঞরা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতায় মার্কেটে স্থায়িত্ব বজায় থাকবে বলে মনে করছেন। মৌলিক শক্তি—ম্যাক্রোইকনোমিক ভ্যালু, কর পরিবর্তন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ তহবিল—এসব উপাদান সূচককে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারবে। বিশ্লেষকরা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির নতুন ঝুঁকি, ইউএস মনোভাবের পরিবর্তন, জ্বালানি ও কৃষিপণ্য মূল্যবৃদ্ধি—এসব ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ এনেছে। তুলনামূলক বাজেট ফলাফল এবং অর্থনৈতিক ডাটা পর্যবেক্ষণ বিনিয়োগকারীদের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের মনোভাব
পোর্টফোলিও ম্যানেজার থেকে রিটেল ইনভেস্টর, সব স্তরের বিনিয়োগকারীই দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক ফলাফল প্রত্যাশা করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ সূচকগুলোতে ওভারওেট রাখা শুরু হয়েছে এবং এফডিআই প্রবাহ ফেরার সাথেই বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নজরদারি শুরু করেছে।
কর্পোরেট লাভের খবর
ব্যাংক, এফএমসিজি, গাড়িপ্লেয়ারদের প্রথমার্ধের আয় উন্নত হয়েছে। রিয়েল এস্টেটের বিক্রয় চড়াই থেকে বাড়ছে। অবকাঠামো খাতের টার্নওভার পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি এসেছে। এ সব খবর বাজারে উৎসাহ বাড়িয়েছে।
লাইভ কোম্পানির বিস্তারিত
| কোম্পানি | আজকের কর্মক্ষমতা |
|---|---|
| Bajaj Finserv | শীর্ষ লাভকারী; Sensex এ বৃহত্তম অবদানকারী |
| Bajaj Finance | শীর্ষ লাভকারী; Sensex এ বৃহত্তম অবদানকারী |
| Asian Paints | উল্লেখযোগ্য লাভ; রিয়েল্টি সেক্টর লিডার |
| Larsen & Toubro | উল্লেখযোগ্য লাভ; অবকাঠামো সেক্টরে শক্তি |
| Trent | শক্তিশালী ফল; খুচরা সেক্টরে প্রবৃদ্ধি |
| UltraTech Cement | নির্মাণ খাতে অবদান; চমৎকার ফলাফল |
| Eternal | মিডক্যাপ সেক্টরে লাভজনক লেনদেন |
| Adani Ports | লজিস্টিক্সে ইতিবাচক সাড়া; লাভজনক দিন |
| Infosys | মন্দা; প্রযুক্তি সেক্টরে চাপ |
| Tata Motors | মন্দা; অটোমোটিভ সেক্টরে ধাক্কা |
| Tech Mahindra | মন্দা; সফটওয়্যার সেবা খাতে চাপ |
| Axis Bank | মন্দা; ব্যাঙ্কিং সেক্টরে আকাশপাতন |
উপসংহার
মার্কিন ফেডের নরম মনোভাব, বৈশ্বিক টানাপোড়েন কমে যাওয়া এবং শক্তিশালী কর্পোরেট ফলাফল মিলিত হয়ে সূচককে উপরে ঠেলে দিয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই মুহূর্তে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য বজায় রেখে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক নীতিমালার পরিবর্তন বাজারের গতিবিধি নির্ধারণ করবে, যা ভবিষ্যতে শেয়ার কেনাবেচায় সহায়তা করবে।
