ইরান যুদ্ধে ইউরোপের অর্থনীতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
ইরান যুদ্ধে স্ট্রেইট অফ হরমুজ বন্ধ হওয়ায় ইউরোপের অর্থনীতি চরম সংকটে পড়েছে। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে তেলের দাম ১০৬ ডলারে পৌঁছেছে এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে ইউরোপে গ্যাসের দাম তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
১. তেল ও গ্যাস সংকটের ভয়াবহতা
ইউরোপ তাদের প্রয়োজনীয় তেলের ৯০ শতাংশই আমদানি করে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে প্রতিদিন সরবরাহ থেকে ২ কোটি ব্যারেল তেল কমে গেছে। এর ফলে জার্মানি ও ইতালির মতো শিল্পপ্রধান দেশগুলোর কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাসের দাম প্রতি MWh ১০০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে।
২. লাগামহীন দ্রব্যস্ফীতি
ইউরোপে দ্রব্যস্ফীতি ১.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.৭ শতাংশ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোলের দাম এরই মধ্যে ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে খাদ্যদ্রব্য, দুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৩. শেয়ারবাজারের অস্থিরতা
যুদ্ধের প্রভাবে জার্মানির শেয়ারবাজার সূচক DAX ৫ শতাংশ এবং ফ্রান্সের CAC ১.১ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের শেয়ারে ধস নেমেছে। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় Shell এবং BP-এর মতো তেল কোম্পানিগুলোর শেয়ারে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
৪. শিল্পোৎপাদন ও কারখানা বন্ধ
জার্মানিতে রাসায়নিক ও গাড়ি তৈরির কারখানায় উৎপাদন ১০ শতাংশ কমেছে। ধারণা করা হচ্ছে রপ্তানি ৫-৭ শতাংশ হ্রাস পাবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চীন ও ভারতের সাথে প্রতিযোগিতায় ইউরোপ পিছিয়ে পড়ছে।
দেশভিত্তিক ক্ষতির তুলনামূলক চিত্র
| দেশ | ক্ষতির ধরন |
|---|---|
| জার্মানি | সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত (গ্যাস সংকট) |
| ইতালি | তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি |
| ফ্রান্স | নিউক্লিয়ার পাওয়ার থাকায় ক্ষতি কিছুটা কম |
| ব্রিটেন | নিজস্ব তেল উত্তোলন ব্যবস্থা আছে |
৫. সংকট মোকাবিলায় ইউরোপের পদক্ষেপ
বর্তমান পরিস্থিতি সামলাতে ইউরোপ তাদের সংরক্ষিত তেলের রিজার্ভ ছাড়ছে। বিকল্প হিসেবে আমেরিকা ও কাতার থেকে গ্যাস আনার চেষ্টা চলছে। তবে এই অবস্থা ৩ মাসের বেশি স্থায়ী হলে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য একটি আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন গঠনের চেষ্টা করছেন।
৬. ভারত ও বাংলাদেশের সাথে তুলনা
ইউরোপের মতো ভারতও তাদের তেলের ৮৫ শতাংশ আমদানি করে, তবে তাদের রিজার্ভ ইউরোপের তুলনায় কম। অন্যদিকে বাংলাদেশে জ্বালানি সাবসিডি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইউরোপের ২৫ শতাংশ নিউক্লিয়ার এনার্জি ব্যাকআপ থাকলেও আমাদের সেই সুবিধা বর্তমানে নেই।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি: ৩ মাস যুদ্ধ চললে কী হবে?
- বিশ্ব জিডিপি: ২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
- তেলের দাম: ১৪০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
- বেকারত্ব: ইউরোপে প্রায় ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারে।
- মুদ্রা মান: ইউরো ডলারের বিপরীতে ৩০ শতাংশ দুর্বল হতে পারে।
সতর্কবার্তা: ইরান যুদ্ধ ৩ মাস স্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়বে। ভারত ও বাংলাদেশের মুদ্রার মানে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সর্বদা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য টিপস:
- তেল কোম্পানির শেয়ার পর্যবেক্ষণ করুন।
- গাড়ি ও এয়ারলাইন্স খাতের শেয়ার এড়িয়ে চলাই ভালো।
- নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা (Gold) বেছে নিতে পারেন।
- ডিফেন্স বা প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলো ভালো পারফর্ম করতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি:
- পেট্রোল ও ডিজেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।
- চাল, ডাল ও দুধের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
- বিদ্যুৎ বিল ও গ্যাস সিলিন্ডারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা।
