ভারত আজ উন্নয়নশীল দেশগুলোর শক্তিশালী কণ্ঠস্বর : বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO)

ফাইন্যান্স ভিশন
By -
0

লেখক: ফাইন্যান্স ভিশন

তারিখ: ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) বিশ্ব অর্থনীতির একটি মূল স্তম্ভ, যেখানে ১৬৪টি দেশের বাণিজ্য নিয়মাবলী নির্ধারিত হয়। এই মঞ্চে ভারতের ভূমিকা এবং সাম্প্রতিক অবস্থানগুলো বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে এবং নিজের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় অনড় অবস্থান বজায় রাখছে।

গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে ভারত এখন আর কেবল একজন অংশগ্রহণকারী নয়, বরং একটি শক্তিশালী 'নেগোশিয়েটর' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।ভারতকে আজ শুধুমাত্র একটা উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে ধরলে ভুল হবে । ভারত নিজস্বতা আজ বিশ্ববাসীর কাছে বারবার প্রমান করে যাচ্ছে । এই নিবন্ধে আমরা ভারতের প্রধান ভূমিকা, চ্যালেঞ্জ এবং সমর্থক গোষ্ঠীগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

India's WTO role

ভারতের WTO-তে প্রধান ভূমিকা: কী কী দিকে নজর ?

WTO-এর আলোচনায় ভারতের অবস্থান সবসময়ই উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। নিচে প্রধান দিকগুলোর সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

  1. খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি ভর্তুকি (Agriculture & Food Security)
    ভারত সবসময়ই দাবি করে আসছে যে, দেশের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পাবলিক স্টকহোল্ডিং (Public Stockholding) বা শস্য মজুত করার অধিকার থাকা জরুরি। গতকালের আলোচনাগুলোতেও ভারত স্পষ্ট করেছে যে, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) এবং কৃষি ভর্তুকি নিয়ে উন্নত দেশগুলোর চাপ তারা মেনে নেবে না। ভারত একটি স্থায়ী সমাধানের (Permanent Solution) জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষকরা সুরক্ষিত থাকে। এটি ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।
  2. মৎস্য চাষে ভর্তুকি (Fisheries Subsidies) অগ্রাধিকার
    মৎস্য আহরণে ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে WTO-তে দীর্ঘদিনের বিতর্ক চলছে। ভারতের অবস্থান স্পষ্ট:
    • ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের সুরক্ষা: বড় বড় শিল্পোন্নত দেশগুলো সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার জন্য দায়ী, তাই তাদের ভর্তুকি কমানো উচিত।
    • ভারত তার নিজের ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো আপস করতে রাজি নয়। এটি ভারতের উপকূলীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল।
  3. ই-কমার্স এবং ডিজিটাল শুল্ক (E-commerce Moratorium) অবস্থান
    অনলাইন কেনাকাটা বা ডিজিটাল লেনদেনের ওপর শুল্ক (Customs Duty) না বসানোর যে নিয়ম (Moratorium) চলে আসছে, ভারত তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ভারতের যুক্তি হলো, এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশাল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। ভারত চায় যাতে দেশগুলো নিজস্ব ডিজিটাল নীতি তৈরি করতে পারে, যা স্থানীয় ই-কমার্স শিল্পকে শক্তিশালী করবে।
  4. আইপিআর এবং জনস্বাস্থ্য (IPR & Public Health) ভূমিকা
    ওষুধ এবং ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (IPR) শিথিল করার জন্য ভারত সবসময়ই সোচ্চার। বিশেষ করে জীবনদায়ী ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে ভারত WTO-তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। COVID-19 মহামারীর সময় ভারতের ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং রপ্তানি এই অবস্থানের একটি জ্বলজ্বল উদাহরণ।
  5. আরও পড়ুন : কেন বিগ টেক কোম্পানিগুলো ভারতের ওপর বিশাল বাজি ধরছ ?
  6. সংস্কার কর্মসূচি (WTO Reforms)ব্যবস্থা
    ভারত WTO-এর কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য এর বিবাদ মীমাংসা ব্যবস্থার (Dispute Settlement Mechanism) সংস্কার চায়। অনেক সময় উন্নত দেশগুলো এই ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, যার বিরুদ্ধে ভারত সোচ্চার। ভারতের লক্ষ্য হলো একটি নিরপেক্ষ এবং সকলের জন্য সমান ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর আধিপত্য: ভারতের জন্য কী কী বাধা?

শিল্পোন্নত দেশগুলোর (যেমন—আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন) একচেটিয়া আধিপত্য WTO-তে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বেশ কিছু বড় বাধা তৈরি করছে। ভারত এখন আর একা নয়; বড় একটি দেশীয় জোট তার পাশে দাঁড়িয়েছে। নিচে প্রধান বাধাগুলো তুলে ধরা হলো:

বাধার ধরন বর্ণনা ভারতের প্রভাব
ভর্তুকি নিয়ে বৈষম্য (Double Standards in Subsidy) আমেরিকা বা ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের কৃষকদের বিশাল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়, যা WTO-তে আইনত বৈধ। কিন্তু ভারতের MSP-কে 'বাণিজ্য বিরোধী' বলে বাধা দেওয়া হয়। খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত, দরিদ্র কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত।
প্রযুক্তি ও মেধা-স্বত্বের একচেটিয়া অধিকার (IPR Monopoly) উন্নত দেশগুলো TRIPS-এর মাধ্যমে ওষুধ বা গ্রিন টেকনোলজির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। ভারত বা আফ্রিকার দেশগুলো কম দামে জীবনদায়ী ওষুধ বা প্রযুক্তি পায় না।
পরিবেশের দোহাই দিয়ে নতুন বাধা (Green Barriers) 'কার্বন ট্যাক্স' বা পরিবেশগত মানদণ্ডের নামে নতুন নিয়ম। ভারতের ইস্পাত-অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানি বাধাগ্রস্ত, উৎপাদন খরচ বাড়ে।
ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম গুগল, আমাজনের মতো কোম্পানিগুলো বিনা শুল্কে ব্যবসা করে। ভারতের মতো দেশগুলো ই-কমার্স শুল্ক থেকে বঞ্চিত, রাজস্ব হানি।

এই বাধাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে, যা WTO-এর মূল লক্ষ্য—সমান বাণিজ্যের—বিরোধী।

ভারতের সমর্থনে যে দেশগুলো পাশে দাঁড়িয়েছে: গ্লোবাল সাউথের জোট

ভারত বর্তমানে 'গ্লোবাল সাউথ' বা বিশ্বের উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর অলিখিত নেতা হিসেবে কাজ করছে। ভারতের সমর্থনে প্রধানত তিনটি বড় গোষ্ঠী সক্রিয়:

  • জি-৩৩ (G-33): কৃষি ইস্যুতে ভারত এই গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেয়, যেখানে ৪৭টি দেশ রয়েছে। তারা ভারতের মতোই কৃষকদের ভর্তুকি ও খাদ্য নিরাপত্তার দাবি সমর্থন করে।
  • আফ্রিকান গ্রুপ (African Group): এখানে ৫৪টি দেশ রয়েছে। মেধা-স্বত্ব (IPR) শিথিল করা এবং ওষুধের সহজলভ্যতার প্রশ্নে তারা ভারতের প্রধান সঙ্গী।
  • এলডিসি (LDCs - Least Developed Countries): বিশ্বের অতি দরিদ্র দেশগুলোও ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করে, কারণ ভারতের জয় মানে তাদেরও সুবিধা হওয়া।
  • এসিপি (ACP - African, Caribbean and Pacific): এই গোষ্ঠীর দেশগুলোও বাণিজ্যের অসম নিয়মের বিরুদ্ধে ভারতের পাশে দাঁড়ায়।

সারকথা: সব মিলিয়ে WTO-তে প্রায় ৮০ থেকে ১০০টিরও বেশি দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করছে। ভারতের শক্ত অবস্থানের কারণেই উন্নত দেশগুলো এখন আর নিজেদের ইচ্ছা মতো নিয়ম চাপিয়ে দিতে পারছে না।

উপসংহার: ভারতের ভবিষ্যৎ পথচলা

WTO-তে ভারতের ভূমিকা শুধুমাত্র জাতীয় স্বার্থ রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্লোবাল সাউথের অধিকারের প্রতীক। সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতে ভারতের অনড় অবস্থান দেখিয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো আর পিছু হটবে না। ভবিষ্যতে এই জোট আরও শক্তিশালী হলে, বিশ্ব বাণিজ্য আরও ন্যায়সঙ্গত হবে। ভারতের এই লড়াই আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণা।

আমাদের সাথে থাকুন! এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী খবর জানতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default