বাজারের ঝড়োপাত: সোনার দাম আকাশছোঁয়া হলো, শেয়ার বাজার কাঁপছে বিশ্বের অনিশ্চয়তার আঘাতে!

ফাইন্যান্স ভিশন
By -
0

বাজার পতনের মধ্যে সোনার দাম বেড়েছে বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার কারণে

ভারতীয় এবং বিশ্বব্যাপী বাজারগুলোতে আজ একদিনে মিশ্র ফলাফল দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদের হ্রাস নিয়ে আশাবাদের সঙ্গে দেশীয় কর সংস্কার এবং মুদ্রার অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগের ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যস্ত ছিলেন। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বাজারের অস্থিরতাকে আরও তীব্র করেছে।

ভারতে অর্থনীতি ও কর ব্যবস্থা

আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যে একটি হলো ১৬তম কর আয়োগের প্রতিবেদন। এই আয়োগের চেয়ারম্যান অরভিন্দ পানগড়িয়া-নেতৃত্বাধীন কমিশন তার প্রতিবেদনটি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিয়েছে। এতে ২০২৬-৩১ অর্থবছরের জন্য কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলোর মধ্যে সম্পদ বিতরণের সুপারিশ করা হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই কাঠামো আগামী কয়েক বছরে ভারতের ফিসকাল ফেডারেলিজমকে নতুন করে গড়ে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন বাড়বে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের খরচের চাপও বাড়তে পারে।

এদিকে, সরাসরি কর সংগ্রহে ইতিবাচক খবর। অক্টোবর মাসে সরাসরি কর আয় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১২.৯২ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর পিছনে কর্পোরেট আয়ের উন্নতি এবং ব্যক্তিগত আয়করের বৃদ্ধি প্রধান কারণ। কেন্দ্রীয় সরকারের একজন কর বিশেষজ্ঞ বলেন,
“এই বৃদ্ধি অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সংকেত, কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর চাপ কমানোর জন্য আরও সংস্কার দরকার।”

কর্পোরেট খাতে ইনফোসিসের ১৮,০০০ কোটি টাকার শেয়ার বাইব্যাক প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু এর সঙ্গে করের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরাসরি কর বোর্ড (সিবিডিটি) আয়কর ফেরতের বিলম্ব নিয়ে সতর্কবাণী জারি করেছে। তাদের মতে, ভুল দাবি এবং লাল নিশানায় চিহ্নিত কলকাটি এর কারণে অনেক করদাতা অপেক্ষায় আছেন। একজন কর পরামর্শক বলেন, “এই বিলম্ব ব্যবসায়ীদের নগদ প্রবাহে প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে ছোট কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে।”

সোনা ও মুদ্রার প্রবণতা

গত সপ্তাহের তীব্র পতনের পর সোনার দাম আজ উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার করেছে। ২৪ ক্যারেট সোনা প্রতি গ্রাম ১২,৭০৪ টাকায় এবং ২২ ক্যারেট ১১,৬৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিবাহ মৌসুমের চাহিদা এবং দুর্বল রুপির কারণে আমদানি সোনার খরচ বেড়েছে। রুপি ডলারের বিপরীতে চাপের মুখে রয়েছে, যা আমদানি খরচ এবং মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাপী, সোনার ফিউচার্স ৪,০৭৯.৫০ ডলার প্রতি আউন্সে স্থিতিশীল হয়েছে, যখন রুপার দাম ৪৯.৯১ ডলারের কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে। একজন সোনা বাজার বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, “অনিশ্চয়তার এই পরিবেশে সোনা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে। ভারতে বিবাহের সিজন এটাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।” মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত, রুপি ডলারের সঙ্গে ৮৩.৫০-এর কাছাকাছি ঘুরছে, যা আমদানিকারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

শেয়ার বাজারের গতিবিধি

ভারতীয় শেয়ার বাজারে আজ হতাশাজনক দিন। সেনসেক্স ১২১ পয়েন্ট নেমে ৮১,০৫৮-এ বন্ধ হয়েছে, যখন নিফটি ২৬,০০০-এর নিচে নেমে ২৫,৯৪৭-এ স্থিতিশীল হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটের ইতিবাচক সংকেত সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। মার্কিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১.৫৫ শতাংশ উঠে ৬,০২২-এ পৌঁছেছে, এবং নাসড্যাক ২.৬৯ শতাংশ বেড়ে ২৪,৩৮৯-এ বন্ধ হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদ হ্রাসের আশায় এই উত্থান ঘটেছে।

এশিয়ান বাজারগুলোতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ০.৬৫ শতাংশ উঠে ৪১,০২৯-এ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি ০.৭৫ শতাংশ বেড়ে ২,৮০১-এ পৌঁছেছে। কিন্তু ইউরোপীয় সূচকগুলো মিশ্র। এফটিএসই এবং সিএসি সূচক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নেমেছে। একজন বাজার বিশ্লেষক বলেন, “ফেডের সিদ্ধান্তের দিকে সবার দৃষ্টি, কিন্তু ভারতে কর সংস্কারের ছায়া বিনিয়োগকে সতর্ক করে তুলেছে।”

বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও কর ব্যবস্থা

আন্তর্জাতিকভাবে কর প্রয়োগ আরও কঠোর হচ্ছে। কর কর্তৃপক্ষগুলো সন্দেহজনক কর এড়ানোর অভিযোগে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ক্ষমতা বাড়িয়েছে। কর্পোরেট খাতে ম্যাক্সিও এবং অ্যানরকের অংশীদারিত্ব ঘোষণা করা হয়েছে, যা সাস কোম্পানিগুলোর জন্য ভ্যাট/জিএসটি সম্মতি সহজ করবে। এটি ক্রস-বর্ডার কর সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাপী কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে এমন অংশীদারিত্ব অপরিহার্য, যাতে ব্যবসা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে।”

ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, মুদ্রার ওঠানামা এবং কর সংস্কারের কারণে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। ভারতীয় পরিবারগুলোর জন্য সোনার দাম বাড়ায় উৎসবের খরচ কমতে পারে, যখন ব্যবসায়ীরা কঠোর কর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী, সবার দৃষ্টি মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যা ডিসেম্বর মাসের বাজারের টোন নির্ধারণ করবে।

সারসংক্ষেপ:

এই বাজারের অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি শিক্ষা: বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও এবং দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু বিশ্বের ঝড়ের মুখে সতর্কতা অপেক্ষাকৃত। আপনার মতামত কী? কমেন্টে জানান!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default