আমেরিকার জাতীয় ঋণ বর্তমানে প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে — যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই বিশাল ঋণের পেছনে রয়েছে ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়, কর রাজস্বের পতন, এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অচলাবস্থা। এই প্রবন্ধটি এই ভয়াবহ ঋণ বৃদ্ধির কারণ এবং এর বৈশ্বিক ঝুঁকিগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবে।
কেন এত বিশাল মার্কিন জাতীয় ঋণ জমেছে?
গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার আয়ের তুলনায় প্রায় ১.৭৬ ট্রিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে। অর্থাৎ, সরকারের আয় কমলেও ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে।
এর মূল কারণগুলো হলো—
- বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা বৃদ্ধি, যার ফলে মেডিকেয়ার ও সোসিয়াল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
- কর নীতিতে ছাড় এবং ট্যারিফ থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব না পাওয়া, যা সরকারের আয় হ্রাস করেছে।
ফলস্বরূপ, সরকার বাধ্য হয়েছে বেশি ঋণ নিতে, যা জাতীয় ঋণের পাহাড় তৈরি করেছে।
ডেটসিলিং (Debt Ceiling) কী এবং কেন এটি বারবার বাড়াতে হয়?
“Debt Ceiling” বা ঋণের সীমা হচ্ছে সরকারের সর্বাধিক ঋণগ্রহণের নির্ধারিত সীমা। এই সীমা না বাড়ালে সরকার নিজের দৈনন্দিন দায়িত্ব — যেমন বেতন প্রদান, ঋণের সুদ পরিশোধ ও সামাজিক ব্যয় — সম্পন্ন করতে পারে না।
যখন সরকার অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তখন এই সীমা আবারও বাড়াতে হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া সবসময়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, যার ফলে বাজারে অস্থিরতা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়। যদি সময়মতো সীমানা বাড়ানো না হয়, তাহলে ঋণখেলাপি (default) হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় — যা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পুনরাবৃত্তি হলে কী ঘটতে পারে?
যদি আবারও ২০০৮ সালের মতো সংকট দেখা দেয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নেমে আসবে।
- বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে,
- হাউজিং মার্কেট ভেঙে পড়বে,
- বিনিয়োগ কমে যাবে,
- এবং বৈশ্বিক বাজারে চেইন রিঅ্যাকশন সৃষ্টি হবে।
যদিও বর্তমানে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেক শক্তিশালী, তথাপি ছায়া ব্যাংকিং (shadow banking) ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থা আবারও বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
আমেরিকার ঋণের মূল উৎস দুটি
- বাজেট ঘাটতি: সরকারের ব্যয় আয়ের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে বেশি।
- জনসংখ্যার বার্ধক্যজনিত ব্যয় বৃদ্ধি: সোসিয়াল সিকিউরিটি ও মেডিকেয়ারের জন্য ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
এই দুটি কারণই ঋণের স্থায়ী ও দ্রুত বৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি।
রোনাল্ড রেগান থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প: ঋণ বৃদ্ধির ইতিহাস
ঋণ বৃদ্ধির ইতিহাস শুরু হয় রোনাল্ড রেগান যুগে, যখন কর হ্রাস ও সামরিক ব্যয় একসাথে বৃদ্ধি পায়। এরপর ক্রমান্বয়ে—
- জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ ও বিল ক্লিনটন প্রশাসনেও অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন ঘটে,
- জর্জ ডব্লিউ. বুশ-এর সময়ে যুদ্ধ ব্যয় ও কর ছাড়ে ঋণ আরও বাড়ে,
- আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কর সংস্কার ও ব্যয় পরিকল্পনা ঋণ বৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
ফলে, প্রায় চার দশকের ধারাবাহিক নীতিগত সিদ্ধান্তই আজকের বিশাল ঋণ সমস্যার পেছনে দায়ী।
চীন ও রাশিয়ার "ডলারবিহীন বিশ্ব" পরিকল্পনা: ডলারের আধিপত্য কি সংকটে?
চীন ও রাশিয়া মার্কিন ডলারের আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। তারা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার করছে এবং ডলারবিহীন বাণিজ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। এর লক্ষ্য একটাই — মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা এবং নতুন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করা।
আমেরিকা যদি দেউলিয়া হয়। তা হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ৭টি মারাত্মক প্রভাব
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: আমেরিকা দেউলিয়া হলে (U.S. default বা bankruptcy হলে) অন্য দেশগুলোর অর্থনীতি কীভাবে প্রভাবিত হবে? এটি কেবল অর্থনীতির নয়, বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
১. বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে ধস
আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং মার্কিন সরকারি বন্ডকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়—
- বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হবে,
- স্টক মার্কেটে ব্যাপক পতন ঘটবে,
- ডলার-নির্ভর বন্ড ও সম্পদের মূল্য হ্রাস পাবে।
ফলাফল: বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজার, বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারেও বড় ধস দেখা দেবে।
২. ডলারের প্রতি আস্থা কমে যাবে
ডলার বর্তমানে বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি। যদি যুক্তরাষ্ট্র ঋণ খেলাপি হয়, তবে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার ধরে রাখার আগ্রহ হারাবে।
- ডলারের মান কমে যাবে,
- ইউরো, ইউয়ান বা এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
৩. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিপর্যয়
বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০% লেনদেন হয় ডলারে। যদি আমেরিকা অর্থনৈতিকভাবে অচল হয়ে যায়—
- ব্যাংকিং ও পেমেন্ট সিস্টেমে বাধা আসবে,
- আন্তর্জাতিক লেনদেনে লিকুইডিটি সংকট তৈরি হবে,
- রপ্তানি ও আমদানির খরচ বেড়ে যাবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো (যেমন বাংলাদেশ, ভারত) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ বড়।
৪. বৈশ্বিক বিনিয়োগে স্থবিরতা
আমেরিকা দেউলিয়া হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের সন্ধান করবে। ফলে: বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে, নতুন প্রকল্প থমকে যাবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে FDI হ্রাস পাবে।
৫. মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধি
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হলে অনেক দেশ নিজস্ব মুদ্রা রক্ষা করতে সুদের হার বাড়াবে। এতে ব্যবসায়িক ঋণের খরচ, উৎপাদন ব্যয় ও পণ্যের দাম উভয়ই বাড়বে।
৬. উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ ঝুঁকি (বাংলাদেশ, ভারত)
আমেরিকার দেউলিয়া অবস্থা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশের জন্য বিপজ্জনক হবে, কারণ—
- তাদের রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে,
- যুক্তরাষ্ট্র তাদের রপ্তানি বাজারের প্রধান ক্রেতা,
- অনেক দেশ আমেরিকান ডলারে ঋণ নিয়েছে।
৭. ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলে, চীন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নতুন আর্থিক জোট গঠনে সক্রিয় হবে, যা বিশ্বশক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনবে।
প্রভাবের সারসংক্ষেপ
| প্রভাবের ধরন | সম্ভাব্য ফলাফল |
|---|---|
| আর্থিক বাজার | শেয়ারবাজারে পতন, বন্ডের মান হ্রাস |
| ডলার | মূল্যহ্রাস, রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে আস্থা কমে যাওয়া |
| উন্নয়নশীল দেশ | রেমিট্যান্স ও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত |
| ভূ-রাজনীতি | চীনের প্রভাব বৃদ্ধি, ডলারের বিকল্প জোরদার |
Moody's-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট: আমেরিকার রেটিং অবনমন
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় উদ্বেগ প্রকাশ করে, সম্প্রতি Moody's Ratings তাদের রেটিং অ্যাকশন ঘোষণা করেছে।
- রেটিং অবনমন: Moody's, আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী ইশুয়ার রেটিং **Aaa থেকে কমিয়ে Aa1** এ নামিয়ে এনেছে। এটি তিনটি প্রধান রেটিং এজেন্সির মধ্যে Moody's-এর শেষ সর্বোচ্চ রেটিং হারানোর ঘটনা।
- আউটলুক: রেটিং আউটলুককে 'নেগেটিভ' থেকে 'স্থিতিশীল' (Stable) এ পরিবর্তন করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে Aa1 লেভেলে ঝুঁকিগুলো আপাতত ভারসাম্যপূর্ণ।
- কারণ: এই অবনমনের মূল কারণ হলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি ঋণ ও সুদের হার বৃদ্ধি, যা অন্যান্য উচ্চ-রেটেড সার্বভৌম দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
- বিশেষ উদ্বেগ: Moody's উল্লেখ করেছে যে মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে বৃহৎ বাজেট ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান সুদের ব্যয় হ্রাসে ব্যর্থ হয়েছে। তারা মনে করে, বাধ্যতামূলক ব্যয় এবং সুদের পেমেন্ট ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৮% এ পৌঁছাতে পারে।
- ধনাত্মক দিক: রেটিং কমানো হলেও, Moody's স্বীকার করেছে যে আমেরিকার অর্থনীতি বিশাল, স্থিতিস্থাপক এবং ডলারের বিশ্বব্যাপী রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ভূমিকা এটিকে একটি অসাধারণ আর্থিক সক্ষমতা দেয়।
ভবিষ্যতে কি ডলারের জায়গা নেবে ক্রিপ্টো বা ইউয়ান?
বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন প্রশ্ন উঠছে — ডলারের জায়গা কি ক্রিপ্টোকারেন্সি বা চীনের ইউয়ান নিতে পারবে? চীন ইতোমধ্যেই ইউয়ান-নির্ভর ডিজিটাল কারেন্সি ও স্টেবলকয়েন তৈরিতে কাজ করছে। অন্যদিকে, বিটকয়েন ও অন্যান্য ক্রিপ্টো ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ভূমিকা নিচ্ছে। যদিও এখনও ডলারের বিকল্প সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়, তবে ডিজিটাল মুদ্রা ও বহুমুদ্রাভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনীতি ভবিষ্যতের দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
উপসংহার
আমেরিকার ঋণ সংকট কেবল একটি দেশের সমস্যা নয়—এটি বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার অন্যতম বড় ঝুঁকি। ঋণের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, কার্যকর কর নীতি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই ঋণ চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন। আর আমেরিকার যেকোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও গভীরভাবে নাড়া দেবে।
এই বিষয়ে আপনার মতামত কী? মন্তব্য নিচে জানাতে ভুলবেন না।
আমাদের সাথে থাকুন! এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী খবর জানতে নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।
যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য সংকট: দ্বিতীয় মাসে সরকারি স্থবিরতার জেরে লক্ষাধিক আমেরিকান অনাহারের মুখে

